ফুটবলের সর্বকালের সেরা কে? বিতর্কের কোনো শেষ নেই

ফুটবলের ইতিহাসে ‘সর্বকালের সেরা’ ফুটবলার কে—এই প্রশ্নের কোনো একক, নির্দ্বিধায় গ্রহণযোগ্য উত্তর নেই। যুগে যুগে এ নিয়ে আলোচনা, বিতর্ক, আবেগের কোনো ঘাটতি হয়নি। কেউ বলেন পেলে, কেউ ম্যারাডোনা, আবার কেউ বলেন মেসি বা রোনালদো। যুক্তি আর পরিসংখ্যান হাজির করেও সমাধানে পৌঁছানো সম্ভব নয়, কারণ প্রত্যেক মহাতারকার পক্ষেই রয়েছে শক্তপোক্ত দল।
আরো পড়ুনবাচ্চাদের হাতে স্মার্টফোন: উপকার নাকি স/র্ব/না/শ?
সম্প্রতি ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব ফুটবল হিস্ট্রি অ্যান্ড স্ট্যাটিসটিকস (আইএফএফএইচএস) একটি তালিকা প্রকাশ করেছে, যেখানে সর্বকালের সেরা ১০ ফুটবলারের নাম রয়েছে। সেই তালিকায় শীর্ষে আছেন আর্জেন্টিনার লিওনেল মেসি। তবে এ তালিকা নিয়েও বিতর্কের ঝড় উঠেছে। পেলে, ম্যারাডোনা কিংবা রোনালদোর ভক্তদের পক্ষে এটি মেনে নেওয়া সহজ নয়।
তবে এই আলোচনায় ঢোকার আগে সংস্থাটি সম্পর্কে একটু ধারণা থাকা দরকার। জার্মান ক্রীড়া ইতিহাসবিদ আলফ্রেড পোগে ১৯৮৪ সালে প্রতিষ্ঠা করেন আইএফএফএইচএস। সংস্থাটি মূলত ফুটবল সংক্রান্ত রেকর্ড, পরিসংখ্যান ও ইতিহাস সংরক্ষণে কাজ করে। যদিও ফিফার অধিভুক্ত নয়, তবে তাদের বিভিন্ন রেকর্ড ও পুরস্কার ফিফার স্বীকৃত। বিশ্বের ২১১টিরও বেশি ফুটবল খেলা দেশের প্রতিনিধিরা এতে জড়িত। প্রতিবছর বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে সেরা খেলোয়াড়, কোচ, রেফারি প্রভৃতি নির্বাচন করে এই সংস্থা।
আরো পড়ুন নারী টি – টোয়েন্টি আয়োজনে স্বাগতিক বাংলাদেশ।
তবে সর্বকালের সেরা খেলোয়াড় নির্বাচন করার পদ্ধতি আইএফএফএইচএস স্পষ্টভাবে জানায়নি। স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যম Marca জানিয়েছে, ব্যক্তিগত ও দলীয় পরিসংখ্যান ও সাফল্যের ভিত্তিতেই এ তালিকা তৈরি হয়েছে বলে ধারণা করা যায়।
মেসির দৃষ্টান্তই ধরা যাক। বার্সেলোনার হয়ে ৩৫টি, পিএসজির হয়ে ৩টি, ইন্টার মায়ামির হয়ে ২টি এবং আর্জেন্টিনার হয়ে ৬টি—মোট ৪৬টি দলীয় শিরোপা জিতেছেন তিনি। এর সঙ্গে রয়েছে ৮টি ব্যালন ডি’অর, ইউরোপিয়ান গোল্ডেন শু, ফিফা বিশ্বকাপের গোল্ডেন বল, কোপা আমেরিকার সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কারসহ অসংখ্য ব্যক্তিগত স্বীকৃতি।
তালিকার দ্বিতীয় স্থানে থাকা ব্রাজিলিয়ান কিংবদন্তি পেলের শিরোপার সংখ্যা মেসির তুলনায় কম, মোট ২৯টি। তবে তিনবার বিশ্বকাপ জেতার কীর্তি আজও কেউ ভাঙতে পারেনি। যদিও তাঁর খেলার সময় ব্যালন ডি’অর শুধুমাত্র ইউরোপিয়ানদের দেওয়া হতো, পরবর্তীতে ফ্রান্স ফুটবল সাময়িকী জানিয়েছিল, সে নিয়ম না থাকলে পেলে অন্তত সাতবার এ পুরস্কার পেতেন।
তৃতীয় স্থানে আছেন ’৮৬ বিশ্বকাপজয়ী ডিয়েগো ম্যারাডোনা। মোট ১১টি শিরোপা জিতলেও তাঁর দলীয় এবং ক্লাব পর্যায়ে প্রভাব এতটাই গভীর ছিল যে, অনেকের চোখেই তিনি অতুলনীয়। একক নৈপুণ্যে আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপ জেতানো, নাপোলির মতো ক্লাবকে ইউরোপের চূড়ায় তোলা—সবই তাঁকে ইতিহাসের পাতায় অবিস্মরণীয় করে রেখেছে।
চতুর্থ স্থানে আছেন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো, যিনি সর্বোচ্চ আন্তর্জাতিক গোলদাতাও বটে। জাতীয় ও ক্লাব পর্যায়ে ৩৫টি শিরোপা জিতেছেন তিনি। তবে বিশ্বকাপ না জেতার কারণে হয়তো শীর্ষ তিনে জায়গা হয়নি তাঁর।
পাঁচে আছেন ডাচ কিংবদন্তি ইয়োহান ক্রুইফ, যিনি ‘টোটাল ফুটবল’ ধারার প্রবক্তা। বিশ্বকাপ না জিতলেও আয়াক্সকে তিনবার ইউরোপসেরা করা, ফুটবলের কৌশলগত দিক বদলে দেওয়ায় তাঁর প্রভাব অপরিসীম।
ছয়ে রয়েছেন রোনালদো নাজারিও। দু’বার বিশ্বকাপ জিতলেও তাঁর ঝুলিতে নেই চ্যাম্পিয়নস লিগের শিরোপা।
সপ্তম স্থানে থাকা জিনেদিন জিদান ফ্রান্সের হয়ে বিশ্বকাপ ও রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে চ্যাম্পিয়নস লিগ জিতেছেন। অষ্টম ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ার, নবম আলফ্রেডো ডি স্টেফানো এবং দশম রোনালদিনিও—তাঁদের ক্ষেত্রে ফুটবলে প্রভাবটাই মূল বিবেচ্য ছিল বলেই মনে করা হয়।
বিশেষ করে রোনালদিনিওর কথা বললে বলতে হয়, তিনি এমন একজন খেলোয়াড় যিনি শুধু শিরোপা জেতেননি, মাঠে মানুষকে হাসতেও শিখিয়েছেন। একমাত্র খেলোয়াড় হিসেবে জিতেছেন বিশ্বকাপ, কোপা আমেরিকা, কনফেডারেশনস কাপ, চ্যাম্পিয়নস লিগ, কোপা লিবার্তোদোরেস এবং ব্যালন ডি’অর—অর্থাৎ সম্ভাব্য সব বড় ট্রফিই তাঁর ঝুলিতে।
এই তালিকায় ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা থেকে তিনজন করে আছেন। বাকি চারজন জার্মানি, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস ও পর্তুগালের প্রতিনিধি। ১০ জনের মধ্যে সাতজনের ঝুলিতে রয়েছে বিশ্বকাপ শিরোপা।

