বিপ্লব এক বছরের মাথায়ই বেহাল দশায়: গোলাম মাওলা রনি

বিপ্লব এক বছরের মাথায়ই বেহাল দশায়: গোলাম মাওলা রনি
সাবেক সংসদ সদস্য, রাজনীতিবিদ ও কলাম লেখক গোলাম মাওলা রনি বলেছেন, ২০২৪ সালের জুলাই মাসের যে বিপ্লব, যা পূর্ণতা পেয়েছিল আগস্টের ৫ তারিখে, সেটি মাত্র এক বছরের মাথায় এসে চরম বেহাল দশায় পড়েছে—যা ছয় মাস আগেও কল্পনা করা যায়নি। শুক্রবার (১ আগস্ট) নিজের ইউটিউব চ্যানেলের এক ভিডিও বার্তায় তিনি এ মন্তব্য করেন।
রনি বলেন, আমাদের বাঙালি সমাজে বিপ্লব একটি দুর্লভ বিষয়। আমাদের জাতীয় চরিত্রে দীর্ঘ সময় ধরে বিপ্লব, গেরিলা যুদ্ধ বা সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়া কঠিন। কারণ আমরা সহজেই ধৈর্য হারাই। তাই দেশের ইতিহাসে ঘটে যাওয়া বড় বড় পরিবর্তনগুলো খুব কম সময়ের মধ্যেই চূড়ান্ত পরিণতি পায়। যেমন, মুক্তিযুদ্ধ নয় মাসে শেষ হয়নি; বরং শত বছরের সংগ্রামের ফল হিসেবে এসেছে। অন্যদিকে, ফরাসি বিপ্লবের পেছনে ছিল অন্তত একশ বছরের প্রস্তুতি, আর বিপ্লবের পরও তাদের লড়াই চলেছে আরও দীর্ঘ সময় ধরে।
তিনি আরও বলেন, প্যালেস্টাইন, কুর্দিস্তান বা বালুচিস্তানের মতো জাতিগোষ্ঠী বছরের পর বছর লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে, যা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। বাংলাদেশের যেসব গণজাগরণ বা অভ্যুত্থান ঘটেছে, সেগুলোও সাধারণত ৩০-৬০ দিনের মধ্যেই চূড়ান্ত হয়ে যায়। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ঘটনাবলিও সে রকমই ছিল; কার্যক্রম ও সাফল্য সবই ৬০ দিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল বলে এটাকে প্রকৃত বিপ্লব বলা যাচ্ছে না।
রনি বলেন, শেখ হাসিনার সরকারের বিরুদ্ধে আরব বসন্ত বা পশ্চিমা স্টাইলের মতো কোনও সুস্পষ্ট ন্যারেটিভ তৈরি হয়নি। ফলে এক বছরে এই ‘বিপ্লব’ যেটাকে অনেকে গণ-অভ্যুত্থান বলতে চেয়েছেন, তার নেতারা আজ মুখ থুবড়ে পড়েছেন। ‘বিপ্লব বিপ্লবীদের খেয়ে ফেলে’—ফরাসি বিপ্লব থেকে জন্ম নেওয়া এই কথার বাস্তব প্রতিফলন আমরা এখন দেখতে পাচ্ছি।
তিনি বলেন, ফ্রান্সের মতো দেশে একশ বছরের প্রস্তুতি আর বিপ্লব-পরবর্তী শতাব্দীর লড়াইয়ের পর গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হয়েছে। কিন্তু আমাদের দেশে সেই ধৈর্য বা কাঠামো নেই। ইরানের ইসলামী বিপ্লবের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, ইরানের নেতৃত্ব বিপ্লবের চেতনা টিকিয়ে রাখতে শুরু থেকেই সঠিক পরিকল্পনা করেছে, তাই সেখানে বিপ্লব বিপ্লবীদের খেয়ে ফেলতে পারেনি। কিন্তু বাংলাদেশে আমরা সেই ব্যর্থতাই দেখছি।
রনি আরও বলেন, এক সময়ের ‘স্বর্ণ মানব’ বলে পরিচিত বিপ্লবের নায়কদের এখন চাঁদাবাজ, গুন্ডা, ধর্ষক বা ইভটিজারের মতো নানা অপবাদ দেওয়া হচ্ছে। তাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে, বন্ধন ছিন্ন হয়েছে, একে অপরের বিরুদ্ধে অভিযোগ-আক্রমণ চলছে। ফলে এক বছরের মাথায় পুরো বিপ্লব কার্যত ভেঙে পড়েছে।
তিনি বলেন, প্রথমে ছাত্রজনতার হাতে ক্ষমতা ছিল, পরে তা গেল সমন্বয়কদের কাছে, সেখান থেকে সরকারের হাতে, তারপর এনসিপি, জামায়াত ও বিএনপির মধ্যে ভাগাভাগি হতে হতে এখন সবার মধ্যে বিভাজন তৈরি হয়েছে। প্রথম কয়েক মাস যে ঐক্য ছিল, তা এখন অহি-নকুল সম্পর্কের জায়গায় পৌঁছেছে।
তিনি অভিযোগ করে বলেন, এনসিপি দাবি করছে, এই বিপ্লবে শিবির বা জামায়াতের ভূমিকা ছিল না, আর শিবির বলছে, সব লজিস্টিক সাপোর্ট তারা দিয়েছে, বিপ্লবীরা শুধু ঘোষণা দিয়েছে। এ নিয়ে দ্বন্দ্ব তীব্র হচ্ছে, যা পুরো আন্দোলনকেই দুর্বল করে দিয়েছে।
শেষে গোলাম মাওলা রনি বলেন, “যারা এই বিপ্লব নিয়ে স্বপ্ন দেখেছিল, তাদের আশা এখন আতঙ্কে পরিণত হয়েছে। আমরা চাই, দ্রুত একটি সঠিক গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ফিরে গিয়ে জনগণের ভোটের মাধ্যমে প্রতিনিধি নির্বাচন করতে পারি—এটাই এখন আমাদের প্রধান কামনা।”
আরও পড়ুন: শুল্ক কমানোর বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্রকে বাংলাদেশ কী কী দিচ্ছে তা কেউ বলছে না: আলতাফ পারভেজ