সন্তান জন্মের পরই মা-শিশুর মৃত্যু, ভাইরাল ভিডিও ঘিরে হাসপাতালে ক্ষোভ

ভারতের মধ্যপ্রদেশে সন্তান জন্ম দেওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ২৫ বছর বয়সী এক নারীর মৃত্যু হয়েছে। একই সঙ্গে মারা গেছে তার নবজাতক সন্তানও। মৃত্যুর আগে ওই নারীর ধারণ করা একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। সেখানে তাকে হাসপাতাল থেকে নিয়ে যাওয়ার জন্য স্বজনদের কাছে বারবার আকুতি জানাতে দেখা যায়।
ভিডিওতে ওই নারীকে কান্না ও চিৎকার করতে দেখা যায়। একপর্যায়ে তিনি অভিযোগের সুরে বলেন, এভাবে চিকিৎসা চলতে থাকলে হাসপাতালের লোকজনই তাকে মেরে ফেলবে। পরিবারের অভিযোগ, যথাসময়ে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা না পাওয়ায় মা ও শিশুর মৃত্যু হয়েছে। যদিও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে অবহেলার অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মৃত নারীর নাম কল্পনা মিশ্র। তিনি মধ্যপ্রদেশের রেওয়া জেলার হাতওয়া এলাকার বাসিন্দা। বিয়ের পর প্রথম সন্তানের অপেক্ষায় ছিলেন তিনি।
পরিবারের সদস্যরা জানান, মঙ্গলবার প্রসবের জন্য কল্পনাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। প্রসবের সময় তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে শুরু করে। চিকিৎসাধীন অবস্থায় বৃহস্পতিবার তার মৃত্যু হয়। সন্তান জন্মের পরপরই নবজাতকটিও মারা যায়।
কল্পনার চাচা ধর্মেন্দ্র মিশ্র জানান, হাতওয়াতেই কল্পনার বিয়ে হয়েছিল। প্রথম সন্তানকে ঘিরে পরিবারের মধ্যে আনন্দের প্রস্তুতি চলছিল। কিন্তু সন্তানকে নিয়ে বাড়ি ফেরার বদলে শেষ পর্যন্ত মা ও নবজাতক দুজনের মরদেহ নিয়ে ফিরতে হয়েছে তাদের।
এদিকে কল্পনার মৃত্যুর আগে ধারণ করা ভিডিওটি প্রকাশ্যে আসার পর ঘটনাটি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। ভিডিওতে দেখা যায়, নারী ওয়ার্ডের ভেতরে কল্পনা অত্যন্ত অসুস্থ ও অস্থির অবস্থায় ছিলেন। তিনি সেখান থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করছিলেন এবং স্বজনদের কাছে যেতে চাইছিলেন। এ সময় নার্সিং বিভাগের কয়েকজন কর্মী তাকে আটকে রেখে হাসপাতালে থাকার জন্য বোঝানোর চেষ্টা করেন।
কল্পনার বাবা রামশরণ মিশ্র মেয়ের মৃত্যুর জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। তার অভিযোগ, মেয়ের শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণের জন্য তিনি চিকিৎসকদের একাধিকবার অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু তার কথায় যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।
রামশরণের দাবি, সময়মতো প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও চিকিৎসা না পাওয়ায় কল্পনার শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি হয়।
তিনি বলেন, কল্পনা ছিলেন তার একমাত্র সন্তান। মেয়ের বিয়ের জন্য তিনি প্রায় ১৫ লাখ রুপি মূল্যের জমি বিক্রি করেছিলেন। মেয়ের এমন মৃত্যু কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না তিনি। চিকিৎসায় কারও গাফিলতি প্রমাণিত হলে তাদের বিরুদ্ধে এফআইআর এবং দায়িত্বে থাকা চিকিৎসক ও কর্মীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তিনি।
পরিবারের পক্ষ থেকে অ্যানেসথেশিয়া নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন তোলা হয়েছে। স্বজনদের অভিযোগ, অ্যানেসথেশিয়া দেওয়ার পর কল্পনার আর জ্ঞান ফেরেনি। অতিরিক্ত মাত্রায় অ্যানেসথেশিয়া প্রয়োগ করা হয়েছিল কি না এবং এর সঙ্গে মৃত্যুর কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না, সেটিও তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তারা।
মা ও নবজাতকের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর হাসপাতাল চত্বরে উত্তেজনা তৈরি হয়। চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ তুলে এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে কল্পনার স্বজনেরা হাসপাতালের প্রধান ফটকের সামনে অবস্থান নেন। প্রায় চার ঘণ্টা ধরে সেখানে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি বিরাজ করে।
শুরুতে পরিবারের সদস্যরা দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত ময়নাতদন্তে সম্মতি দিতে চাননি। পরে হাসপাতালের ডিন চিকিৎসক সুনীল আগরওয়াল ও সুপারিনটেনডেন্ট চিকিৎসক রাহুল মিশ্র ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন। তাদের সঙ্গে পরিবারের সদস্যদের প্রায় দুই ঘণ্টা বৈঠক হয়।
বৈঠকের পর জেলা হাসপাতালের চিকিৎসকদের মাধ্যমে কল্পনার ময়নাতদন্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পাশাপাশি প্রাথমিকভাবে দুই নার্সিং কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। তারা হলেন সাধনা ভার্মা ও সীমা মুজালদে।
ঘটনাটি খতিয়ে দেখতে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটিও গঠন করেছে কর্তৃপক্ষ। তদন্তে কারও বিরুদ্ধে দায়িত্বে অবহেলা বা অন্য কোনো অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে প্রশাসন।
হাসপাতালের ডিন চিকিৎসক সুনীল আগরওয়াল ঘটনাটিকে অত্যন্ত দুঃখজনক হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি জানান, পরিবারের পক্ষ থেকে ওঠা প্রতিটি অভিযোগ তদন্তের আওতায় আনা হয়েছে। বিশেষ করে রোগীর কেন জ্ঞান ফেরেনি, সেটিও তদন্ত করে দেখা হবে।
অন্যদিকে হাসপাতালের সুপারিনটেনডেন্ট চিকিৎসক রাহুল মিশ্র চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে অবহেলার অভিযোগ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন। তার দাবি, হাসপাতালের নির্ধারিত চিকিৎসা প্রটোকল অনুসরণ করেই কল্পনার চিকিৎসা করা হয়েছে। চিকিৎসকদের পক্ষ থেকে কোনো গাফিলতি ছিল না। তবে পরিবারের অভিযোগগুলো তদন্ত করে দেখা হচ্ছে এবং ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
এ ঘটনার পাশাপাশি মধ্যপ্রদেশের সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থায় চিকিৎসক সংকটের বিষয়টিও সামনে এসেছে। ২০২৫-২৬ সালের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, রাজ্যটিতে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের জন্য অনুমোদিত ৫ হাজার ৪৪৩টি পদের মধ্যে কর্মরত আছেন মাত্র ১ হাজার ৪৯৫ জন। ফলে খালি রয়েছে ৩ হাজার ৯৪৮টি পদ, যা মোট অনুমোদিত পদের ৭২ শতাংশেরও বেশি।
চিকিৎসক সংকট শুধু বিশেষজ্ঞ পর্যায়েই নয়। মেডিকেল অফিসারের জন্য রাজ্যে অনুমোদিত পদ রয়েছে ৬ হাজার ৫১৩টি। এর মধ্যে ২ হাজার ৬৮৯টি পদ বর্তমানে শূন্য। অর্থাৎ মোট পদের ৪০ শতাংশের বেশি এখনো পূরণ হয়নি।
কল্পনা মিশ্র ও তার নবজাতকের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ কী ছিল এবং চিকিৎসায় কোনো ধরনের অবহেলা হয়েছিল কি না—এখন তদন্তের ফলাফলের দিকেই তাকিয়ে পরিবার ও স্থানীয়রা।