সাত মাসে ৪০০ ধর্ষণ, শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার ঘটনা ৬০৬

নারী, শিশু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সুরক্ষায় সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে বিভিন্ন সেবা চালু থাকলেও সমন্বয়হীনতা, সেবা গ্রহণের জটিলতা এবং পুনর্বাসনের সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে। বিশেষ করে গ্রাম ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের অনেক মানুষ আইনগত সহায়তা ও সুরক্ষামূলক সেবা সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য না জানায় প্রয়োজনের সময় সহায়তা নিতে পারছেন না।
বুধবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে আয়োজিত এক অংশীজন সংলাপে বক্তারা এসব সমস্যা তুলে ধরেন। ‘নারী, শিশু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সুরক্ষায় ঐক্যবদ্ধ উদ্যোগ, ন্যায়বিচারে প্রবেশাধিকার ও সেবা প্রদান জোরদারকরণ’ শীর্ষক এ সংলাপের আয়োজন করে আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)।
সংলাপে সভাপতিত্ব করেন আসকের নির্বাহী পরিচালক তাহমিনা রহমান। তিনি চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সাত মাসের সহিংসতার পরিসংখ্যান তুলে ধরে জানান, এ সময়ে নারীদের ধর্ষণের ৪০০টি, ধর্ষণের পর হত্যার ৩৭টি এবং ধর্ষণচেষ্টার ১৫২টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে।
একই সময়ে শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার ৬০৬টি ঘটনা রেকর্ড করা হয়। এর মধ্যে ধর্ষণের ঘটনা ২৪১টি এবং শিশু হত্যার ঘটনা ২১৩টি। এ ছাড়া নারী ও কিশোরীদের যৌন হয়রানি ও উত্ত্যক্তের ১৯১টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে।
মানব পাচারের চিত্রও তুলে ধরে তাহমিনা রহমান বলেন, ২০২৫ সালে এ-সংক্রান্ত ১ হাজার ১২৬টি নতুন মামলা হয়েছে। ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত বিচারাধীন ও তদন্তাধীন মামলার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ২৮৪টিতে।
সংলাপে উপস্থাপিত মূল নিবন্ধে জাতীয় আইনগত সহায়তা অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটের তথ্য উল্লেখ করে বলা হয়, ২০০৯ সাল থেকে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত আইনগত সহায়তা ও সচেতনতামূলক কার্যক্রমের আওতায় উপকৃত হয়েছেন ১৮ লাখ ৪৬ হাজার ৭৯৯ জন।
এর মধ্যে সুপ্রিম কোর্ট আইনগত সহায়তা কার্যালয়ের মাধ্যমে ৩১ হাজার ২২২ জন এবং দেশের ৬৪টি জেলা আইনগত সহায়তা কার্যালয়ের মাধ্যমে ১৩ লাখ ৩৩ হাজার ৭৭৭ জন সেবা পেয়েছেন।
তবে আইনগত সহায়তা পাওয়ার আবেদন প্রক্রিয়ায় নানা জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রতার বিষয়টি নিবন্ধে উঠে আসে। একাধিক ধাপে অনুমোদন, নিয়মিত সভা না হওয়া এবং আবেদন বাতিলের পর আপিলের জটিলতা সেবা গ্রহণে বাধা সৃষ্টি করছে। এতে আর্থিকভাবে অসচ্ছল বিচারপ্রার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যয় বহন করাও কঠিন হয়ে পড়ছে।
সংলাপে জানানো হয়, জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতার শিকার নারীদের জন্য দেশে ৯৫টি ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার (ওসিসি) ও সেল রয়েছে। তবে এসব প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসা, ফরেনসিক পরীক্ষা, আইনগত সহায়তা, মনোসামাজিক সেবা ও পুনর্বাসনের সমন্বিত ব্যবস্থা সব ক্ষেত্রে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
এ ছাড়া অনেক কেন্দ্রে ২৪ ঘণ্টা সেবা, নির্দিষ্ট ডায়াগনস্টিক ল্যাব এবং কাউন্সেলিংয়ের জন্য পৃথক জায়গার অভাব রয়েছে বলে আলোচনায় উল্লেখ করা হয়।
বাংলাদেশ আইনগত সহায়তা অধিদপ্তরের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ রেজমিন সুলতানা বলেন, নারী, শিশু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার যাতে লঙ্ঘিত না হয়, সেটিই প্রকৃত সুরক্ষার লক্ষ্য। তবে অধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটলে দ্রুত প্রতিকার নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয় জরুরি।
সংলাপে আরও বক্তব্য দেন জিএফএ কনসাল্টিং গ্রুপের নাগরিকতা, সিভিক এনগেজমেন্ট ফান্ড প্রকল্পের ডেপুটি টিম লিডার ক্যাটরিনা কইনিগ, উইমেন সাপোর্ট অ্যান্ড ইনভেস্টিগেশন বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার লিজা বেগম, মহিলা ও শিশু বিষয়ক অধিদপ্তরের আইন কর্মকর্তা আইভি আক্তার, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ওসিসি কোঅর্ডিনেটর ডা. তাইয়েবা সুলতানা এবং নারীপক্ষের প্রোগ্রাম ম্যানেজার কামরুন্নাহার।
আলোচনায় নারী, শিশু, যুব ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য বিদ্যমান সেবাগুলো আরও সহজলভ্য করা, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় গড়ে তোলা এবং ন্যায়বিচার ও পুনর্বাসনের সুযোগ সম্প্রসারণে বিভিন্ন সুপারিশ তুলে ধরা হয়।

