বাবাকে হারিয়ে গরুর হাটে আরিফুল, নবম শ্রেণির ছাত্রের কাঁধে সংসারের বোঝা

ঢাকার বছিলা গরুর হাটে ৪ জুন সকালে গরুর গলায় দড়ি ধরে দাঁড়িয়ে ছিল এক কিশোর। পাশে কেউ নেই। চোখেমুখে দিশেহারা ভাব। নবম শ্রেণির ছাত্র আরিফুল হক হঠাৎ করেই যেন পুরো পরিবারের ভার কাঁধে তুলে নিয়েছে।
আরিফুলের বাবা কোহিনূর শেখ ছিলেন রাজশাহীর বাঘা উপজেলার নীচ পলাশী ফতেপুর গ্রামের নিবন্ধিত জেলে। প্রতিবছর কোরবানির ঈদ উপলক্ষে কয়েকটি গরু পালন করতেন। এবারও তিনটি গরু নিয়ে ঢাকার হাটে যাচ্ছিলেন। সঙ্গে ছিলেন ছেলে আরিফুলও। পরিকল্পনা ছিল—বাবা গরু বিক্রি করে বাড়ি ফিরবেন, আর আরিফুল ঢাকার বিমানবন্দর থেকে খালাকে নিয়ে আসবেন। খালার জন্য সঙ্গে ছিল নতুন জামাকাপড়ও।
তবে ১ জুন গভীর রাতে টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে ভয়াবহ এক সড়ক দুর্ঘটনায় সব পরিকল্পনা ওলটপালট হয়ে যায়। গরুবোঝাই ট্রাকের পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা কোহিনূর শেখ ঘটনাস্থলেই নিহত হন। ছেলেকে রেখে যান ভয়াবহ এক বাস্তবতার মুখোমুখি।
আরিফুল বাবার লাশ নিয়ে রাজশাহী ফিরে যান। দাফন-কাফনের পরদিন আবার ঢাকার পথে ছুটে যান গরুগুলো বিক্রি করতে। কারণ, বাবার নেওয়া ঋণ শোধ করতেই হবে।
আরো পড়ুন…রাজনীতিতে এখনই নেই ডা. জুবাইদা রহমান, মানবিক কাজে মনোনিবেশ
নদীভাঙনের মানুষ, ঋণে জর্জরিত পরিবার
কোহিনূর শেখ ছিলেন নদীভাঙনের শিকার। একসময় ছয়–সাত বিঘা জমির মালিক থাকলেও এখন আর নিজস্ব কোনো জমি নেই। পদ্মা নদীর ভাঙনে জমি হারিয়ে নিঃস্ব হন। মাছ ধরা ও কৃষিকাজে জীবিকা চললেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আয় কমে এসেছে। এবার সাড়ে চার বিঘা জমিতে পেঁয়াজ চাষ করে প্রায় তিন লাখ টাকা লোকসান গুনতে হয়েছে।
পরিবারের সদস্যরা জানান, প্রবাসী আত্মীয়ের কাছ থেকে ধার নিয়ে গরু পালতেন কোহিনূর। ঢাকায় গিয়ে নগদ টাকায় গরু বিক্রি করে সেই ঋণ শোধ করার ইচ্ছা ছিল। স্থানীয় বাজারে বিক্রি করলে অনেক সময় টাকাও পাওয়া যায় না, কখনো লেনদেন নিয়ে সালিশ পর্যন্ত গড়ায়।
দুর্ঘটনার বর্ণনা
সেই রাতে গরুবোঝাই ট্রাকটি দেওহাটা এলাকায় থামানো ছিল। সঙ্গে থাকা ব্যবসায়ী মোবারক হোসেন জানান, মাঝেমধ্যে গরুর শরীরে পানি ছিটাতে হয়, লেজ টেনে দাঁড় করিয়ে রাখতে হয়। এমন অবস্থায় হঠাৎ একটি সবজিবোঝাই ট্রাক এসে ধাক্কা দেয়। গুরুতর আহত হন কোহিনূর শেখ। হাসপাতালে নেওয়ার পর তাঁকে মৃত ঘোষণা করা হয়।
আরো পড়ুন…অবৈধ অনুপ্রবেশ ইস্যুতে ভারতকে কনস্যুলার সংলাপের প্রস্তাব বাংলাদেশের
গরু না বিক্রি হলে কী হবে?
৪ জুন, হাটে দাঁড়িয়ে থাকা আরিফুল জানান, এখনো একটি গরুও বিক্রি হয়নি। যাঁরা দেখছেন, তাঁরা ন্যায্য দাম না বলেই চলে যাচ্ছেন। বাবার শেষ মুহূর্তের স্মৃতি এখনো তার মনে গেঁথে আছে। কাঁপা কণ্ঠে বলছিল, “গাড়ি থাইকা লাফ দিয়ে নামলাম। পানির জন্য ড্রাইভারে ইশারা করলাম। আব্বার মাথায় পানি দিলাম। ডাক দিলাম—আব্বা কথা কন। কিন্তু আব্বা কোনো কথা কইলেন না।”
পরিবারের আর কেউ নেই
কোহিনূরের মেয়ে আমেনা খাতুন জানান, “ভাইডা আমার নিঃস্ব, এতিম হইয়া গেল। আমার বাপের কোনো ভাই ছিল না। আরিফুলও একা। আমাদের আর কোনো অভিভাবক নাই। মায়ের কানতে কানতে গলা ভাইঙি গিছে, কথা বলতে পারতেছেন না।”
ঋণের বোঝা, সংসারের দায়িত্ব, আর বাবার মৃত্যুর শোক—সবকিছু একসঙ্গে মাথায় নিয়ে আরিফুল এখনো ঢাকায় বছরের সবচেয়ে বড় গরুর হাটে দাঁড়িয়ে আছে। তার একটাই লক্ষ্য—বাবার শেষ রেখে যাওয়া গরুগুলো বিক্রি করে ঋণ শোধ করা, সংসারটাকে টিকিয়ে রাখা।

