ইহুদি জাতি সৃষ্টির ইতিহাস

“…Centuries will pass, but from the rubble of our city, our hatred of those who are to blame, international Jewry and its lackeys…I have made it clear that if they treat the nations of Europe as tools that may be bought and sold by these international swindlers for money and material support, then that race, the Jewish race, which is truly responsible for this murderous struggle, shall bear the consquences…Above all, I oblige the national leadership and its followers to observe the racial laws scrupulously and subject the poisoner of all nations — international Jewry — to merciless resistance.”
—Hitler’s will, written only a few hours before his suicide
April 29, 1945
শতাব্দী চলে যাবে, কিন্তু আমাদের শহর ও স্মৃতিস্তম্ভের ধ্বংসাবশেষ থেকে শেষ পর্যন্ত দায়ীদের বিরুদ্ধে ঘৃণা বেড়ে যাবে ,যাদের সবকিছুর জন্য দায়ী থাকবে আন্তর্জাতিক ইহুদি এবং তার সাহায্যকারীরা।
সর্বোপরি আমি জাতির নেতৃবৃন্দকে এবং তাদের অধীনস্থ ব্যক্তিদেরকে জাতিগত আইনের কঠোরভাবে পালন করার জন্য এবং সকল মানুষের সর্বজনীন বিষাক্ত, আন্তর্জাতিক ইহুদিদের নির্দয় বিরোধিতার জন্য অভিযুক্ত করছি।
১৯৪৫ সালের ২৯ এপ্রিল হিটলার সুইসাইড করার ঠিক আগ মুহূর্তে এই ভাষন দেন। ইহুদীদের প্রতি হিটলারের ছিলো প্রবল রাগ ও তীব্র ঘৃণা। ২য় বিশ্বযুদ্ধে হিটলার জার্মান নাৎসি দ্বারা গনহত্যা চালিয়ে প্রায় ৬০ লক্ষ ইহুদি হত্যা করে।
হিটলারের ইহুদি নিধনের মিশনে সে সময়ে তিনি ইতিহাসের খলনায়ক বিবেচিত হলে আজকের বিশ্ব ঠিক আচ করতে পেরেছে ইহুদি উগ্র জাতির ভয়াবহতা।
কিন্তু কবে এই ইহুদিরা ফিলিস্তিন দখল করে সেখানে নিজেদের অধিপত্য বিস্তার করে?কি তাদের অতীত ইতিহাস?
চলুন জেনে নেয়া যাক ইসরাইল নামক ইহুদি রাষ্ট্র সৃষ্টির অতীত ইতিহাস ।
সময়টা তখন ১৯২০ সাল।
আনুষ্ঠানিকভাবে ব্রিটিশরা তখন ফিলিস্থিনের শাসনভার গ্রহণ করে যা ১৯৪৮ সালের মে মাস পর্যন্ত বিদ্যমান ছিলো।এটি ছিল জর্ডান নদীর পশ্চিম দিকের ভূখণ্ডে, যেখানে বর্তমান ইসরায়েল অবস্থিত।তবে ব্রিটিশদের হাতে সৃষ্টি ইসরায়েলের আত্মপ্রকাশ ঘটেছিল তারও অনেক আগে।
সাল তখন ১৮৯৭ ,
আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মপ্রকাশ করা হয় এবং উৎযাপন বিশ্ব ইহুদীবাদী সংস্থার ২০ তম বছর।ইহুদিরা বাইবেলকে ব্যবহার করে সুনিপুণভাবে এক কল্পকাহিনি সাধারণ মানুষের কাছে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলার দীর্ঘমেয়াদি এক প্রকল্প নিয়ে এগোচ্ছিল।
আজ থেকে শতবর্ষ আগে,ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী লর্ড আর্থার বালফোর ১৯১৭ সালের ২ নভেম্বর ইহুদীবাদী নেতা ব্যারন রথচাইল্ডকে একটি ছোট পত্র লিখেন। এটি কালক্রমে বালফোর ঘোষণাপত্র নামে পরিচিতি পায়।এর মধ্য দিয়ে বালফোর এই উগ্র ইহুদিবাদ বা ইহুদি জাতীয়তাবাদকে স্বীকৃতি দেন, যা কাল্ক্রেম ইহুদিদের প্রভাব বিস্তারে এক মহা বিপর্যয়ের দ্বার খুলে দেয়।
১৯২০ সালে ব্রিটিশরা ফিলিস্তিন দখল করার পর বালফোর ঘোষণার তাৎপর্য আরো বেড়ে যায়। ব্রিটিশরা ফিলিস্তিনের শাসনভার গ্রহণ করার পর থেকেই সেখানকার ৯০ শতাংশ বা তারও বেশি আরব অধিবাসী ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে বৈষম্যমূলক আচরণ ও দমননীতি শুরু করে।
দীর্ঘ মেয়াদে ইহুদিদের জন্য ‘ঈশ্বর প্রতিশ্রুত ভূমি’ বা প্রমিজড ল্যান্ড তাদের হাতে ফিরিয়ে দেওয়ার কৌশল হিসেবে ইহুদি অভিবাসীদের বিভিন্নভাবে অগ্রাধিকার সুবিধা দিতে থাকে।সেই সুবাদে ইহুদিরা আল-আকসাকে কেন্দ্র করে নিজেদের অধিকার সম্প্রসারণে ব্যস্ত হয়ে পড়ে এবং এখানে তাদের ক্যাপিটাল স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেয়।
সাল ১৯২১।
ব্রিটিশরা অভিবাসী ইহুদিদের নিয়ে গঠন করা হয় এর তিনটি প্রধান সংগঠন ছিল হাগানা, ইরগুন ও স্ট্যার্ন গ্যাং। যারা হত্যা, সন্ত্রাস, ধর্ষণ আর ধ্বংসযজ্ঞ সৃষ্টির মাধ্যমে ফিলিস্তিনিদের বাধ্য করে নিজ মাতৃভূমি ছেড়ে চলে যেতে, এভাবে ফিলিস্তিনিদের জমিজমা ইহুদিরা দখল করে নেয়।
১৯২২ সালে ইসরায়েলে ইহুদি ছিল মাত্র ১২ শতাংশ, ১৯৩১ সালে তা হয় ২৩ শতাংশ, আর ১৯৪৭- এ তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩২ শতাংশে।
ফিলিস্তিনে জনসংখ্যার ৬৫ শতাংশ আরব আর ৩৩ শতাংশ ছিল ইহুদি। মোট ভূমির ৮৫ শতাংশের মালিক আরবরা আর ৭ শতাংশের মালিক ইহুদিরা। আরবদের নিয়ন্ত্রণে ৮৫ শতাংশ ভূমি থাকা সত্ত্বেও ফিলিস্তিনের ৪৫.৫ শতাংশ ভূখণ্ড নিয়ে আরব রাষ্ট্র আর ৫৫.৫ শতাংশ নিয়ে ইহুদি রাষ্ট্র গঠন করতে হবে বলে জাতিসংঘ সুপারিশ করে।
১৯৩৯-৪৫ কালপর্বে,
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ডামাডোল আর জার্মানিতে হিটলারের চরম ইহুদিবিদ্বেষ ইহুদীবাদীদের জন্য বিরাট সুযোগ এনে দেয়।বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে ইউরোপে কমবেশি ৬০ লাখ ইহুদিকে নিধন করা হয়, যা ইতিহাসে হলোকাস্ট হিসেবে স্বীকৃত।যুদ্ধ শেষে এই হলোকাস্টই ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে ইহুদিদের স্বতন্ত্র আবাসভূমি স্থাপনের সবচেয়ে বড় যৌক্তিকতা হিসেবে তুলে ধরা হয়।
১৯৪৭ সালের নভেম্বর মাসে ফিলিস্তিনের ভূখণ্ডে দু’টি রাষ্ট্র গঠনের সিদ্ধান্ত নেয় জাতিসংঘ। একটি ইহুদিদের জন্য এবং অন্যটি আরবদের জন্য।
ইহুদিরা মোট ভূখণ্ডের ১০ শতাংশের মালিক হলেও তাদের দেয়া হয় মোট জমির অর্ধেক। কিন্তু আরবদের জনসংখ্যা এবং জমির মালিকানা ছিল আরবদের দ্বিগুণ। অবশেষে নানা ঘটনা-পরিক্রমা শেষে ১৯৪৮ সালের ১৪ মে ইহুদিরা ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেয়।স্বভাবতই আরবরা এ সিদ্ধান্ত মেনে নেয়নি। তারা জাতিসংঘের এ সিদ্ধান্ত খারিজ করে দেয়।
জাতিসংঘের এ সিদ্ধান্তের পর আরব এবং ইহুদিদের মধ্যে দাঙ্গা শুরু হয়ে যায়। তখন ফিলিস্তিনী ভূখণ্ড ছেড়ে যাবার জন্য ব্রিটিশ সৈন্যরা প্রস্তুতি নিচ্ছিলো।
সবার দৃষ্টি ছিল জেরুজালেম শহরের দিকে। মুসলমান, ইহুদি এবং খ্রিস্টানদের জন্য পবিত্র এ জায়গা।জাতিসংঘ যে সিদ্ধান্ত দিয়েছিল সেখানে জেরুজালেম আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণে থাকার কথা ছিল।কিন্তু আরব কিংবা ইহুদি- কোন পক্ষই সেটি মেনে নেয়নি। ফলে জেরুজালেম শহরের নিয়ন্ত্রণের জন্য দু’পক্ষের মধ্যে যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে উঠেছিল।জেরুজালেমে বসবাসরত ইহুদীদের অবরুদ্ধ করে রেখেছিল আরবরা। অন্য জায়গার সাথে জেরুজালেমের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
মার্চ,১৯৪৮ সাল।
ইহুদীরা আরবদের উপর পাল্টা আক্রমণ শুরু করে। অনেক বিশ্লেষক বলেন, তখন ইহুদীরা আরবদের নিশ্চিহ্ন করার পরিকল্পনা করেছিল।
১৯৪৮ সালের ১৪ই মে ফিলিস্তিন ছেড়ে চলে যায় ব্রিটেন। একই দিন তৎকালীন ইহুদি নেতারা ঘোষণা করেন যে সেদিন রাতেই ইহুদি রাষ্ট্রের জন্ম হবে। ইসরায়েল রাষ্ট্রের জন্মের এক ঘন্টার মধ্যেই আরবরা আক্রমণ শুরু করে। মিশর, ইরাক, লেবানন, জর্ডান এবং সিরিয়া এই পাঁচটি আরব দেশ ইসরায়েলকে আক্রমণ করে।তীব্র লড়াইয়ের এক পর্যায়ে ইসরায়েলি বাহিনী পিছু হটতে থাকে। তাদের অস্ত্রের মজুত শেষ হয়ে যায়।
সম্ভাব্য পরাজয় আঁচ করতে পেরে ইহুদিরা নিজেদের শক্তি সঞ্চয়ের জন্য সময় নেয় ও জাতিসংঘের মাধ্যমে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়।যুদ্ধবিরতির সময় দু’পক্ষই শক্তি সঞ্চয় করে। কিন্তু ইসরায়েল বেশি সুবিধা পেয়েছিল। তখন চেকোস্লোভাকিয়ার কাছ থেকে আধুনিক অস্ত্রের চালান আসে ইসরায়েলের হাতে।
যুদ্ধ বিরতী শেষ হলে নতুন করে আরবদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে ইসরায়েলি বাহিনী। একর পর এক গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দখল করে নেয় ইহুদিরা।
তেল আবিব এবং জেরুজালেমের উপর তাদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা হয়। জাতিসংঘের মাধ্যমে আরেকটি যুদ্ধ বিরতির মাধ্যমে সে সংঘাত থামে। ১৯৪৭ সালের নভেম্বর মাস থেকে ১৯৪৯ সালের জানুয়ারি মাস পর্যন্ত ছয় হাজার ইহুদি নিহত হয়েছিল।
অনেক ঐতিহাসিকদের মতে, ‘আরব দেশগুলোর মধ্যে পারষ্পরিক আস্থা না থাকার কারণেই ১৯৪৮ সালের যুদ্ধে তারা পরাজিত হয়েছে এবং ইসরায়েল দেশটির জন্ম হয়ে সেটি স্থায়ী হতে পেরেছে।
১৯৪৮ সালের পর থেকে সামরিক, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক দিক থেকে অতি দ্রুত উন্নতি লাভ করে ইসরায়েল। তারা সুপার পাওয়ার হিসেবে আবির্ভূত হয়।
১৯৬৬ সালের পর এই প্রথম ইসরায়েল সরকার সেদেশের আরব সম্প্রদায়ের ওপর জরুরিকালীন ব্যবস্থা প্রয়োগ করেছে।
১৯৬৭ সালে ইসরায়েলি দখলদারি আরও পোক্ত হয় গোলান উপত্যকা, পূর্ব জেরুজালেম ও পশ্চিম তীরে কর্তৃত্ব স্থাপনের মধ্য দিয়ে। আর তা সম্ভব হয় সে বছর আরবদের আরেক দফা পরাজয়ের মধ্য দিয়ে।
১৯৮৭ সালের ডিসেম্বরে গাজা উপত্যকায় প্রথম ফিলিস্তিনি ইন্তিফাদা শুরু হয়।তরুণ ফিলিস্তিনিরা ইসরাইলের সেনাবাহিনীর ট্যাংক ও সৈন্যদের দিকে ঢিল ছুড়লে দ্রুত পশ্চিম তীরে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।এই বিদ্রোহে এক পর্যায়ে অংশ নেয় ইউনিফাইড ন্যাশনাল লিডারশিপ।
ইসরাইলের মানবাধিকার সংস্থা বি’তেসেলেমের মতে, ইন্তিফাদার সময় ইসরাইলের বাহিনীর হাতে এক হাজার ৭০ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে। এর মধ্যে শিশু ছিল ২৩৭ জন। গ্রেফতার করা হয়েছিল এক লাখ ৭৫ হাজারেরও বেশি মানুষকে।
১৯৯৩ সালে “অসলো চুক্তি স্বাক্ষর ও প্যালেস্টাইন অথরিটি (পিএ) গঠনের মাধ্যমে শেষ হয় ইন্তিফাদা। পিএ চুক্তি ইসরাইলকে পশ্চিম তীরের ৬০ শতাংশ ভূখণ্ডের ভূমি ও পানি সম্পদের বেশির ভাগ নিয়ন্ত্রণ দেওয়া হয়।
দ্বিতীয় ইন্তিফাদা ২০০০ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর শুরু হয়েছিল। সে সময় লিকুদ বিরোধী নেতা এরিয়েল শ্যারন জেরুজালেমের পুরাতন শহর ও তার আশপাশে হাজার হাজার নিরাপত্তা বাহিনী নিয়ে আল-আকসা মসজিদ প্রাঙ্গণে সফর করেছিলেন।তখন দুদিনে পাঁচজন ফিলিস্তিনি নিহত ও ২০০ জন আহত হয়েছিল।পিএলও নেতা ইয়াসির আরাফাত ২০০৪ সালে মারা যান। তার এক বছর পর দ্বিতীয় ইন্তিফাদা শেষ হয়।
গাজায় ২০০৮, ২০১২, ২০১৪ ও ২০২১ সালে চারটি দীর্ঘস্থায়ী সামরিক হামলা করেছে ইসরাইল। হামলায় হাজার হাজার ফিলিস্তিনি নিহত ও কয়েক হাজার বাড়ি, স্কুল ও অফিস ভবন ধ্বংস হয়েছে।
৭ই অক্টোবর, ২০২৩।
ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাস ইসরায়েলের গ্রীষ্মকালীন সময় প্রায় ৬ টা ৩০ মিনিটে “অপারেশন আল-আকসা ফ্লাড” শুরু করার ঘোষণা দেয়, এই বলে যে এটি ২০ মিনিটের ব্যবধানে গাজা উপত্যকা থেকে ইসরায়েলে ৫,০০০ টিরও বেশি রকেট নিক্ষেপ করে। ইসরায়েলের মতে আক্রমণের দ্বারা কমপক্ষে ১,২০০ জন ইসরায়েলীয়কে হত্যা করা হয়েছিল।
চলমান এ যুদ্ধে ২ মাসে ১৬ হাজার ১৫ ফিলিস্তিনি ও ৮৮ ইসরায়েলি সেনা নিহত হয়।এর পরে দফায় দফায় চলমান যুদ্ধে বহু ফিলিস্তিনি সৈন্য, সাধারন জনগন, বাচ্চা, শিশু নিহত হয়। ‘পদ্মা টিভি’
নিজস্ব প্রতিবেদক

