স্বামীর কবরের পাশে দুই সন্তান নিয়ে অসহায় জীবন

গাজীপুরের কালিয়াকৈরে স্বামীর কবরের পাশেই দুই ছোট সন্তানকে নিয়ে দিন পার করছেন সোনিয়া বেগম। মাথা গোঁজার নিরাপদ আশ্রয় ও সামান্য সহায়তার আশায় তার অপেক্ষা যেন দিন দিন আরও দীর্ঘ হচ্ছে।
তার পাশে বসে থাকে ৯ বছর বয়সী মেয়ে ছোঁয়া, আর কোলে রয়েছে মাত্র ১৮ মাসের এক শিশুপুত্র। এই হৃদয়বিদারক দৃশ্য স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক সহানুভূতির সৃষ্টি করেছে।
স্থানীয়দের কাছ থেকে জানা যায়, সোনিয়ার স্বামী সুজন মাহমুদের হঠাৎ মৃত্যুর পর থেকেই তার জীবনে নেমে আসে চরম দুর্দশা। সোনিয়ার অভিযোগ, শ্বশুরবাড়ির আর্থিক সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যথাযথ চিকিৎসা না পাওয়ায় তার স্বামীর মৃত্যু হয়েছে।
স্বামীর মৃত্যুর শোক কাটিয়ে ওঠার আগেই তিনি জানতে পারেন, শ্বশুরবাড়িতে তার ও সন্তানদের জন্য আর কোনো জায়গা নেই। সোনিয়ার দাবি, তার শ্বশুর কফিল উদ্দিন ও শাশুড়ি তাদের গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। এমনকি স্বামীর দাফনের সময়ও শ্বশুর স্থান ত্যাগ করেছিলেন বলেও অভিযোগ ওঠে, যা এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে।
দুই সন্তানকে নিয়ে অসহায় হয়ে পড়া সোনিয়াকে প্রথমে স্থানীয় বাসিন্দা সাইফুল ইসলামের পরিবার সাময়িক আশ্রয় দেয়। তবে আইনি জটিলতার আশঙ্কায় সেই আশ্রয় দীর্ঘস্থায়ী হয়নি।
সবশেষে কোনো উপায় না পেয়ে তিনি স্বামীর কবরের পাশেই অবস্থান নিতে বাধ্য হন। বাবার কবরের পাশে দাঁড়িয়ে ছোট্ট ছোঁয়ার নীরব কান্না অনেকের হৃদয় ছুঁয়ে যাচ্ছে।
অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে সোনিয়া বলেন, “স্বামীর মৃত্যুর সময়ও শ্বশুর পাশে থাকেননি। এখন এই দুই সন্তান নিয়ে কোথায় যাবো? থাকার মতো কোনো জায়গা নেই। শ্বশুরবাড়িতেও থাকতে দিচ্ছে না। তাই বাধ্য হয়ে কবরের পাশেই আছি—আল্লাহ যদি কোনো ব্যবস্থা করেন।”
১৮ মাস বয়সী শিশুটি কিছুই না বুঝলেও বড় মেয়ে ছোঁয়া যেন বাবার ভিটায় আশ্রয়ের জন্য নীরবে সংগ্রাম করে যাচ্ছে।
এলাকাবাসীর অনেকেই মনে করছেন, পারিবারিক দ্বন্দ্ব ভুলে অন্তত শিশুদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে তাদের পাশে দাঁড়ানো উচিত ছিল। কিন্তু বাস্তবতা বলছে, তারা এখন অবহেলা আর অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।
ঘটনাটি এলাকায় ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সচেতন মহল প্রশ্ন তুলছে—একটি অসহায় পরিবার কি এভাবেই সমাজের সামনে আশ্রয়হীন হয়ে থাকবে?
স্থানীয় সমাজকর্মীরা প্রশাসনের দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। তাদের দাবি, সোনিয়া ও তার সন্তানদের আইনি অধিকার নিশ্চিত করে নিরাপদ আবাসনের ব্যবস্থা করা হোক।
অন্যদিকে, সুজনের মা সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “এখনই চলে যান, না হলে খারাপ হবে। এত প্রশ্ন করছেন কেন?”
এ বিষয়ে কালিয়াকৈর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শহিদুল ইসলাম জানান, বিষয়টি নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতার চেষ্টা চলছে। সমাধান না হলে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

