অন্তর্বর্তী সরকারের একটি গোপন চুক্তির কারণে রাশিয়া থেকে তেল আমদানির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের অনুমতি নিতে হচ্ছে।

ঢাকায় এক সংলাপে দেশের জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তিনি দাবি করেন, বিদ্যমান আন্তর্জাতিক চুক্তির কিছু শর্তের কারণে রাশিয়া থেকে জ্বালানি আমদানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্রের অনুমতির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে, যা বর্তমান সংকট মোকাবিলায় সরকারের সক্ষমতাকে সীমিত করছে।
মঙ্গলবার রাজধানীর ধানমন্ডিতে সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি) আয়োজিত “নতুন সরকারের প্রথম বাজেট নিয়ে ভাবনা” শীর্ষক আলোচনায় তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানের আয়োজন করে সিটিজেনস প্ল্যাটফর্ম ফর এসডিজিস।
তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ বাণিজ্য ব্যবস্থার কিছু ধারা—বিশেষ করে নিষেধাজ্ঞা সম্পর্কিত বিধান এবং ‘নন-মার্কেট কান্ট্রি’ বিষয়ক শর্ত—বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানির বিকল্প সীমিত করে দিচ্ছে। ফলে কম দামের উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহের সুযোগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
বর্তমান জ্বালানি পরিস্থিতি দেশের অর্থনীতির তিনটি গুরুত্বপূর্ণ খাত—রাজস্বনীতি, বৈদেশিক লেনদেন এবং মুদ্রানীতিতে একযোগে চাপ সৃষ্টি করছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। বিদ্যুৎ খাতে বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল-এর সংস্কার শর্তের মধ্যে সমন্বয় করা সরকারের জন্য কঠিন হয়ে উঠছে।
তার মতে, জ্বালানির দাম বাড়ার কারণে বছরে প্রায় ৪.৮ বিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত আমদানি ব্যয় হতে পারে, যা দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ১.১ শতাংশের সমান। এর ফলে চলতি হিসাবের ঘাটতি বাড়তে পারে এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ তৈরি হয়ে টাকার মান কমার ঝুঁকি বাড়বে।
তিনি আরও সতর্ক করেন, উপসাগরীয় অঞ্চলে অস্থিরতা দেখা দিলে বাংলাদেশের রেমিট্যান্স প্রবাহেও প্রভাব পড়তে পারে, কারণ মোট প্রবাসী আয়ের বড় একটি অংশ ওই অঞ্চল থেকেই আসে।
ড. দেবপ্রিয় বলেন, সরকার এখন এক কঠিন সিদ্ধান্তের মুখোমুখি—রাজস্ব ধরে রাখতে জ্বালানি কর অপরিবর্তিত রাখা হবে, নাকি ভোক্তাদের স্বস্তি দিতে তা কমানো হবে। এদিকে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড-এর বড় অঙ্কের আর্থিক ঘাটতি সামাল দিতে ইতোমধ্যে কিছু খাতে মূল্য সমন্বয় করা হয়েছে।
তবে আন্তর্জাতিক বাজারের পুরো মূল্য যদি দেশীয় বাজারে প্রতিফলিত করা হয়, তাহলে মূল্যস্ফীতি আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, জ্বালানি খাতে অনিশ্চয়তা ও ব্যয় বৃদ্ধি বেসরকারি বিনিয়োগ কমিয়ে দিয়েছে, যা বর্তমানে জিডিপির প্রায় ২২.৫ শতাংশে নেমে এসেছে—গত কয়েক বছরের মধ্যে এটি সর্বনিম্ন।
সবশেষে তিনি বলেন, বর্তমান সংকট মোকাবিলায় এমন নীতি গ্রহণ জরুরি, যেখানে রাজস্ব শৃঙ্খলা, বৈদেশিক স্থিতিশীলতা এবং মূল্যস্ফীতির নিয়ন্ত্রণ—এই তিনটির মধ্যে ভারসাম্য বজায় থাকে। তা না হলে জ্বালানি সংকট বৃহত্তর অর্থনৈতিক অস্থিরতায় রূপ নিতে পারে।

