জেলেদের ভাগ্যে নেই স্বস্তি: নিষেধাজ্ঞা শেষে এবার বাধা আবহাওয়া, উপকূলে বাড়ছে ঋণের বোঝা

🟩 বঙ্গোপসাগরে বৈরী আবহাওয়ার কারণে অনেক জেলেই নামতে পারছেন না সাগরে
🟩 যারা গেছেন, তাদের অনেকে ফিরেছেন খালি হাতে, নেই কাঙ্ক্ষিত ইলিশ
🟩 নিষেধাজ্ঞা, দুর্যোগ ও আয়হীনতা—তিন দিক থেকেই বিপর্যস্ত মাছনির্ভর পরিবারগুলো
🟩 বিশেষজ্ঞের মত—জেলেদের টিকে থাকতে চাই ‘লাইভলি হুড সিকিউরিটি প্যাকেজ’
নিষেধাজ্ঞা উঠে যাওয়ার পর অনেকটা আশায় বুক বেঁধেই সমুদ্রপানে ছুটেছিল উপকূলের হাজারো জেলে পরিবার। ৫৮ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষে মাছ ধরার অনুমতি মিললেও বঙ্গোপসাগরে ঝড়ো হাওয়া, উঁচু ঢেউ আর বৈরী আবহাওয়া আবারও দুঃস্বপ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে তাদের জীবনে। কেউ এখনো ঝুঁকি নিয়ে সমুদ্রে যেতে পারেননি, আর যারা গেছেন, তাদের অনেকেই ফিরে এসেছেন খালি জাল আর হতাশা নিয়ে।
রাঙ্গাবালীর চরমোন্তাজের জেলে রফিক হাওলাদার জানান,
“সাত লাখ টাকার বাজার করে ১৫ দিনের জন্য সমুদ্রে গিয়েছিলাম, কিন্তু ঢেউয়ের জন্য ঠিকমতো জালই ফেলতে পারিনি। কয়েকবার চেষ্টা করেও মাছ পাইনি—শেষে ফিরে আসতে হয়েছে।”
রাঙ্গাবালী উপজেলা মেরিন ফিশারিজ অফিসার এস এম শাহাদাত হোসেন রাজু জানান, “নিষেধাজ্ঞার পর মাছ থাকার সম্ভাবনা থাকলেও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে সেভাবে মাছ ধরা যাচ্ছে না।”
❖ বছরের অর্ধেকের বেশি সময় মাছ ধরায় কোনো না কোনো নিষেধাজ্ঞা
-
প্রতিবছর ১৫ এপ্রিল থেকে ১১ জুন পর্যন্ত ৫৮ দিনের নিষেধাজ্ঞা
-
মা ইলিশ রক্ষায় ২২ দিন (১৩ অক্টোবর–৩ নভেম্বর)
-
মার্চ–এপ্রিলে ২ মাস ইলিশের অভয়াশ্রমে মাছ ধরা বন্ধ
-
জাটকা রক্ষায় ৮ মাস (১ নভেম্বর–৩০ জুন) ধরা নিষিদ্ধ
সব মিলিয়ে প্রায় ২৫০–২৭০ দিন জেলেদের আয়ের পথ কার্যত বন্ধ থাকে। যার ফলে প্রতি বছর কয়েক লাখ উপকূলীয় পরিবারকে পাড়ি দিতে হয় চরম দারিদ্র্য ও ঋণের সাগর।
আরও পড়ুন… হারিয়ে যাচ্ছে শৈল্পিক বাবুই পাখির বাসা, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হয়তো দেখার সুযোগ পাবে না
❖ মাছ নেই, আছে ঋণ ও হতাশা
জেলে আলাউদ্দিন মাঝি বললেন,
“মাছধরা ছাইড়া দিতে চাই, কিন্তু করুম কী? আর কোনো কামকাইজ তো পাই না।”
জেলে হারুন মাঝির কণ্ঠে অনুশোচনা:
“নিষেধাজ্ঞায় ঘরে বসে ছিলাম, এখন আবার আবহাওয়া বাধা। বাজারে দাম বাড়ছে, কিন্তু ঘরে চাল নেই।”
পটুয়াখালী, বরগুনা, ভোলা অঞ্চলে নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত মিলিয়ে দেড় লাখের বেশি জেলে পরিবার রয়েছেন, যাদের অনেকেই বর্তমানে ঋণে জর্জরিত।
❖ প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা ছাড়া উপকূল বাঁচবে না
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মেরিন ফিশারিজ বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান মীর মোহাম্মদ আলী বলেন,
“নিষেধাজ্ঞা পরিবেশের জন্য জরুরি হলেও জেলেদের জন্য কোনো কার্যকর সহায়তা নেই বললেই চলে। তাদের জন্য একটি ‘লাইভলি হুড সিকিউরিটি প্যাকেজ’ গঠন করা জরুরি।”
তিনি আরও বলেন,
“খাদ্য, চিকিৎসা, সহজ ঋণ ও বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা ছাড়া জেলেরা এক ধরনের দারিদ্র্যচক্রে আটকে থাকবেন।”
আরও পড়ুন… পানির দামে দুধ বিক্রি, বিপাকে মানিকগঞ্জের খামারিরা
✅ উপসংহার
জেলেদের সমস্যা শুধু সমুদ্রের নয়, এটা এখন একটি অর্থনৈতিক, মানবিক ও জলবায়ুজনিত সংকট। সময় এসেছে এই পেশাভিত্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে স্থায়ী ও প্রাতিষ্ঠানিক সমাধান নিশ্চিত করার। নয়তো, “রুপালি ইলিশের স্বপ্ন” তাদের জন্য শুধু হতাশার গল্পই হয়ে থাকবে।

