টিকার সংকটে দেশে হামের বিস্ফোরণ, ৪১ শিশুর মৃত্যু!

রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকার বাসিন্দা আকলিমা খাতুন তার এক বছরের ছেলে রিফাত হাসানকে নিয়ে সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে ছুটে এসেছেন। প্রায় এক সপ্তাহ আগে শিশুটির জ্বর শুরু হয়, পরে শরীরে র্যাশ দেখা দিলে একটি বেসরকারি ক্লিনিকের চিকিৎসক হামের লক্ষণ শনাক্ত করেন এবং দ্রুত বিশেষায়িত হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেন।
বর্তমানে সেখানে চিকিৎসা চললেও অতিরিক্ত রোগীর চাপের কারণে শয্যা না পেয়ে মা-ছেলেকে বারান্দাতেই অবস্থান করতে হচ্ছে। আকলিমা জানান, তার ছেলে নিয়মিত টিকা পায়নি। ইপিআই কেন্দ্রে কয়েকবার গেলেও টিকার অভাবে ফিরে আসতে হয়েছে। বাইরে থেকে টিকা সংগ্রহের কোনো ব্যবস্থা আছে কি না, সেটিও তার জানা ছিল না।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে হামের সংক্রমণ বাড়ার অন্যতম প্রধান কারণ টিকা কভারেজ কমে যাওয়া। ইতোমধ্যে এই রোগে ৪১ শিশুর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে, যা পরিস্থিতির ভয়াবহতাই তুলে ধরে।
ইপিআই সূত্রে জানা যায়, দেশে প্রতি বছর প্রায় ৪০ লাখ শিশুর জন্ম হয়। জন্মের পর থেকে ১৮ মাস বয়স পর্যন্ত ১১টি রোগ প্রতিরোধে মোট ৮ ধরনের টিকা দেওয়া হয়। এর মধ্যে রয়েছে যক্ষা, হাম-রুবেলা, পোলিও, হেপাটাইটিসসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ রোগ প্রতিরোধী টিকা।
বাংলাদেশে ১৯৭৯ সাল থেকে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি চালু রয়েছে। এ খাতে বছরে হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয় হয়। আগে অপারেশন প্ল্যান (ওপি)-এর মাধ্যমে টিকা সংগ্রহ করা হলেও ২০২৪ সালের জুনে এই ব্যবস্থা হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায়। এর প্রভাব সরাসরি পড়ে টিকাদান কার্যক্রমে।
পরিসংখ্যান বলছে, টিকা কভারেজে বড় ধরনের পতন ঘটেছে। ২০২২ সালে যেখানে প্রায় ৯৮ শতাংশ শিশু টিকার আওতায় ছিল, সেখানে ২০২৫ সালে তা নেমে এসেছে মাত্র ৫৭.১ শতাংশে।
স্বাস্থ্য খাত সংশ্লিষ্টরা জানান, পাঁচ বছর মেয়াদি স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও জনসংখ্যা কর্মসূচির অধীনে বেশিরভাগ জনস্বাস্থ্য কার্যক্রম পরিচালিত হতো। কিন্তু এই কর্মসূচির ৩৬টি অপারেশন প্ল্যান বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শুধু টিকাদান নয়, জলাতঙ্ক, এইডসসহ বিভিন্ন রোগ নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমও স্থবির হয়ে পড়েছে। এমনকি কালাজ্বর ও ফাইলেরিয়ার মতো নিয়ন্ত্রিত রোগ পুনরায় ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও তৈরি হয়েছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ বলেন, ওপি বন্ধের সিদ্ধান্ত ছিল অপরিকল্পিত। এর ফলে টিকার সরবরাহে বড় সংকট তৈরি হয়েছে। তিনি আরও জানান, বর্তমানে ৯ মাসের আগেই অনেক শিশু হামে আক্রান্ত হচ্ছে, যা উদ্বেগজনক।
এছাড়া আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। বিশেষ করে বিদেশি অর্থায়ন বন্ধ হওয়ায় বিভিন্ন প্রতিরোধমূলক কর্মসূচি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি রশীদ-ই-মাহবুবের মতে, স্বাস্থ্য খাত সংস্কারে যেসব সুপারিশ করা হয়েছিল, সেগুলোর বাস্তবায়নে কার্যকর কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি। অপারেশন প্ল্যান বন্ধ হওয়ায় পুরো ব্যবস্থায় স্থবিরতা নেমে এসেছে।
অন্যদিকে সরকারিভাবে ওষুধ সহজলভ্য করতে ‘ফার্মেসি নেটওয়ার্ক’ গড়ে তোলার পরিকল্পনা থাকলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে সাধারণ মানুষের চিকিৎসা ব্যয়ও কমেনি।
সার্বিকভাবে, টিকার সংকট এবং নীতিগত সিদ্ধান্তের প্রভাবে দেশের জনস্বাস্থ্যব্যবস্থা এখন বড় চ্যালেঞ্জের মুখে। বিশেষজ্ঞরা দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন, যাতে ভবিষ্যতে আরও বড় বিপর্যয় এড়ানো যায়।

