শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নে বাংলাদেশ-চীন অংশীদারত্ব নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে: মাহদী আমিন

শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নে বাংলাদেশ-চীন অংশীদারত্ব নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে: মাহদী আমিন
শিক্ষা, কারিগরি প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়নে বাংলাদেশ ও চীনের যৌথ অংশীদারত্ব দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা ও প্রাথমিক গণশিক্ষা উপদেষ্টা মাহদী আমিন।
শুক্রবার (২৮ আগস্ট) স্থানীয় সময় সকালে চীনের চিয়াংশি সাইন্স অ্যান্ড টেকনোলজি নরমাল ইউনিভার্সিটিতে আয়োজিত ‘চীন-বাংলাদেশ শিক্ষা বিনিময় সম্মেলনে’ তিনি এ কথা বলেন।
সম্মেলনে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা সহযোগিতা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। এর আওতায় বাংলাদেশে ‘চীন-বাংলাদেশ ভোকেশনাল এডুকেশন, ট্রেনিং অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার’-এর প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
মাহদী আমিন বলেন, এই সমঝোতা কেবল আনুষ্ঠানিক কোনো চুক্তিতে সীমাবদ্ধ থাকবে না। তরুণদের দক্ষ করে তোলা, কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি এবং বাস্তবমুখী শিক্ষা নিশ্চিত করাই এই সহযোগিতার মূল লক্ষ্য।
তিনি বলেন, “শিক্ষাকে দক্ষতায়, দক্ষতাকে কর্মসংস্থানে এবং কর্মসংস্থানকে সুযোগে পরিণত করাই আমাদের মূল উদ্দেশ্য।”
বাংলাদেশের পক্ষে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের সচিব মো. দাউদ মিয়া এবং চীনের পক্ষে চিয়াংশি সাইন্স অ্যান্ড টেকনোলজি নরমাল ইউনিভার্সিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট প্রফেসর ঝেং পেংউ সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেন।
সমঝোতা স্মারকের আওতায় দুই দেশের মধ্যে বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ কর্মসূচি, দ্বিভাষিক শিক্ষা উপকরণ, গবেষণা সহযোগিতা, শিক্ষা-শিল্প সংহতি, শিল্পভিত্তিক প্রশিক্ষণ, শিক্ষক ও শিক্ষার্থী বিনিময় এবং বৃত্তিমূলক শিক্ষা প্রশাসকদের বিশেষ প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনার বিষয়ে সহযোগিতার কথা বলা হয়েছে।
এ ছাড়া বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগকৃত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোর বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে।
তিনটি নতুন শিক্ষা ও গবেষণা কেন্দ্রের উদ্বোধন
সম্মেলনের অন্যতম আকর্ষণ ছিল বাংলাদেশ ও চীনের যৌথ উদ্যোগে তিনটি আন্তর্জাতিক শিক্ষা ও গবেষণা সহযোগিতা প্ল্যাটফর্মের উদ্বোধন।
এর মধ্যে ‘চীন-বাংলাদেশ ভোকেশনাল টিচার ট্রেনিং সেন্টার’ উদ্বোধন করেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহসানুল হক মিলন ও চীনের ফ্যান হংহুই।
চিয়াংশি সাইন্স অ্যান্ড টেকনোলজি নরমাল ইউনিভার্সিটিতে ‘বাংলাদেশ ভোকেশনাল এডুকেশন রিসার্চ সেন্টার’ উদ্বোধন করেন মাহদী আমিন ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্টি সেক্রেটারি প্রফেসর পেই হংওয়েই।
এ ছাড়া ‘বাংলাদেশ চাইনিজ ল্যাঙ্গুয়েজ + স্কিল ডেভেলপমেন্ট কোঅপারেশন সেন্টার’ উদ্বোধন করেন মো. দাউদ মিয়া ও প্রফেসর ঝেং পেংউ।
সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, এসব উদ্যোগের মাধ্যমে শিক্ষক প্রশিক্ষণ, শিক্ষার্থীদের ব্যবহারিক শিক্ষা, শিল্প প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংযোগ, পাঠ্যক্রম উন্নয়ন, গবেষণা, চীনা ভাষা শিক্ষা এবং কর্মসংস্থানমুখী দক্ষতা উন্নয়নে বাংলাদেশের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হবে।
‘সমঝোতা বাস্তবায়নই মূল লক্ষ্য’
মাহদী আমিন বলেন, একটি সমঝোতা স্মারক তখনই অর্থবহ হয়ে ওঠে, যখন তা কেবল কাগজে সীমাবদ্ধ না থেকে বাস্তবায়নের মাধ্যমে মানুষের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ ও চীনের জনগণের জন্য এই সহযোগিতাকে বাস্তব সুযোগে পরিণত করাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা আরও বলেন, বৃত্তি, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, শিক্ষক-শিক্ষার্থী বিনিময়, পাঠ্যক্রম উন্নয়ন, শিল্প সংযোগ এবং আধুনিক প্রযুক্তির পাশাপাশি ডিজিটাল প্রযুক্তি, রোবোটিক্স ও স্মার্ট ম্যানুফ্যাকচারিংয়ের মতো উদীয়মান খাতেও দুই দেশের সহযোগিতা বাড়ানো প্রয়োজন।
তিনি শিক্ষার সঙ্গে শিল্প এবং দক্ষতার সঙ্গে কর্মসংস্থানের সংযোগ আরও শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
মাহদী আমিন বলেন, তরুণদের শুধু ডিগ্রি অর্জনের জন্য নয়, বরং ক্যারিয়ার, উদ্ভাবন ও ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করে তুলতে আন্তর্জাতিক মানের কারিগরি শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।
চীনের অভিজ্ঞতা থেকে শেখার আগ্রহ বাংলাদেশের
শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহসানুল হক মিলন শিক্ষা, প্রযুক্তি, কারিগরি প্রশিক্ষণ ও শিল্প উন্নয়নে চীনের অর্জনের প্রশংসা করেন।
তিনি বলেন, আধুনিক ও শিল্প-সংযুক্ত বৃত্তিমূলক শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চীনের অভিজ্ঞতা থেকে শেখার ব্যাপারে বাংলাদেশের গভীর আগ্রহ রয়েছে।
শিক্ষামন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠী দেশের অন্যতম প্রধান শক্তি। তাদের মানসম্মত কারিগরি শিক্ষা, ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ ও আধুনিক দক্ষতায় গড়ে তোলা গেলে তারা বিশ্বব্যাপী প্রতিযোগিতামূলক দক্ষ জনশক্তিতে পরিণত হবে।
তিনি আরও বলেন, কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাকে শিল্প ও কর্মসংস্থান বাজারের প্রকৃত চাহিদার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। এজন্য পাঠ্যক্রম উন্নয়ন, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, আধুনিক প্রযুক্তি, ব্যবহারিক শিক্ষা এবং শিল্প প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অংশীদারত্ব আরও জোরদার করা প্রয়োজন।
১৯টি চীনা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ
চিয়াংশি প্রাদেশিক সরকারের আয়োজনে অনুষ্ঠিত এ সম্মেলনে চীনের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কারিগরি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি, শিক্ষক-গবেষক, শিক্ষার্থী এবং শিল্পোদ্যোক্তারা অংশ নেন।
সম্মেলনে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ১৯টি চীনা বিশ্ববিদ্যালয় ও কারিগরি ইনস্টিটিউটের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
চীন সরকারের আমন্ত্রণে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা বিষয়ক বিভিন্ন আয়োজন এবং আলোচনায় অংশ নিতে তিন দিনের সরকারি সফরে বর্তমানে চীনে রয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহসানুল হক মিলন এবং প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, নতুন সমঝোতা স্মারক এবং তিনটি সহযোগিতা প্ল্যাটফর্ম বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে বৃত্তিমূলক শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন, গবেষণা ও শিল্প-শিক্ষা সংহতিতে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্ব গড়ে তোলার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

