ফেসবুক লাইভে আত্মহত্যা করলেন নান্দাইলের হিরো আলম, পরিবারে শোকের মাতম

ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলার সিংরুল ইউনিয়নের মহাবৈ গ্রামের রাজিব মিয়া ওরফে হিরো আলম (৩২) নামের এক যুবক সৌদি আরবে ফেসবুক লাইভে এসে আত্মহত্যা করেছেন। সোমবার (২ জুন) সকালে দাম্মামে এ মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে।
জানা যায়, প্রায় পাঁচ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে সৌদি আরবে পাড়ি জমিয়েছিলেন হিরো আলম, স্বপ্ন ছিল পরিবারের হাল ধরার। কিন্তু সেই স্বপ্ন এখন শুধুই কান্না আর শোকের স্রোত। মৃত্যুর খবরে বাড়িতে শুরু হয় আহাজারি ও মাতম।
বৃদ্ধা মা আনোয়ারা বেগম (৮০) ছেলের শোকে বারবার মূর্ছা যান। চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে বলেন, “আমার বাজানরে মাইর্যালছে আজিজুইল্যা, হেরে তোমরা ধরো। আমি অহন কারে লইয়া বাচবাম?”
পরিবার জানায়, আজিজুল নামে হোসেনপুর উপজেলার এক দালালের মাধ্যমে হিরো আলম সৌদি যান। কথা ছিল, সেখানে একটি ফ্যাক্টরিতে চাকরি করবেন, বেতন পাবেন ৪০ হাজার টাকা। কিন্তু বাস্তবতা ছিল ভয়াবহ। সৌদি পৌঁছানোর পর আকামা না থাকায় কাজও পাননি, বাধ্য হয়ে পালিয়ে থাকতে হয়।
পরবর্তীতে বড় ভাইয়ের সহায়তায় এক কাজ জুটলেও সেই আয় দিয়ে নিজের খরচ চালানোই কষ্টকর হয়ে পড়ে। এদিকে দেশের পাওনাদাররা স্ত্রীর কাছ থেকে টাকা আদায়ের চেষ্টা চালাতে থাকে, ফলে পরিবার পড়ে ভয়াবহ মানসিক চাপে।
আরও পড়ুন… ধামরাইয়ে মা ও দুই সন্তানের রহস্যজনক মৃত্যু, আত্মহত্যা না পরিকল্পিত হত্যা?
স্ত্রী চাঁদনি বেগমের সঙ্গে প্রতিদিনই টাকার বিষয় নিয়ে ফোনে ঝগড়া হতো, কিন্তু হিরো আলম সাফ জানিয়ে দিতেন, তিনি টাকা পাঠাতে পারবেন না। এক পর্যায়ে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
সোমবার সকাল ১১টার দিকে হিরো আলম তার ভাবি নিপা আক্তারের মোবাইলে অন্য একটি ফোনে ফেসবুক লাইভে কল করেন। সেখানে স্ত্রী চাঁদনির সঙ্গে কয়েক মিনিট কথা বলেন। কথোপকথনের একপর্যায়ে বলেন, “আমি খেয়ে না খেয়ে থাকি, দেশের টাকা পাঠাতে পারবো না। মা ও মেয়েদের দেখো।”
পরে মেয়েদের দেখতে চেয়ে বড় মেয়ে আশা মনি (১২) ও ছোট মেয়ে হাবিবাকে (৭) ফোনে ডেকে নেন। ছোট মেয়ে হাবিবার সঙ্গে কথা বলার সময়ই গলায় ফাঁস নেন হিরো আলম। এরপর ভিডিও কলের স্ক্রিন অন্ধকার হয়ে যায়।
ছোট মেয়ে হাবিবা জানায়, “বাবা বলছিল ভালো করে পড়ালেখা করতে, দোয়া করতে। তারপরই ফাঁসিতে ঝোলে।”
ঘটনার কিছু সময় পর সৌদি আরবে থাকা বড় ভাই আরিফুল ইসলাম নিশ্চিত করেন, রাজিব আত্মহত্যা করেছেন।
আরও পড়ুন… পলাশবাড়ীতে নবদম্পতির ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার, তদন্তে পুলিশ
স্থানীয়রা বলেন, হিরো আলম ছিল একজন সাধারণ, পরিশ্রমী ও স্বপ্নবান যুবক। সে শুধু পরিবারের জন্য লড়ছিল। একটি আদম ব্যবসায়ীর প্রতারণায় শেষ হয়ে গেল একটি জীবন।
অভিযুক্ত দালাল আজিজুল ফোনে জানান, “তিন মাস পর আমার কোনো দায়িত্ব থাকে না। সে কীভাবে টাকা জোগাড় করেছে সেটা আমার দেখার বিষয় না।” এ কথা বলেই ফোন সংযোগ কেটে দেন।
স্থানীয়দের দাবি, আদম ব্যবসায়ী আজিজুলের দ্রুত বিচার হওয়া উচিত, যেন এমন মর্মান্তিক ঘটনা আর না ঘটে।

