মায়ের মৃত্যুর পরও কেন ছিল না কোনো খোঁজ?

ঢাকার একটি আবাসিক এলাকার তিন কক্ষের একটি ফ্ল্যাট থেকে ৭৫ বছর বয়সী নূর জাহান বেগমের পচনধরা মরদেহ উদ্ধার হওয়ার ঘটনায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ ও শয্যাশায়ী এই বৃদ্ধা চরম অবহেলা ও অযত্নের মধ্যে জীবন কাটিয়েছেন।
ফ্ল্যাটটিতে নূর জাহান বেগম তার মেয়ে ফাতেমা নাসরিন সুলতানা কনিকার সঙ্গে বসবাস করতেন। একটি কক্ষে থাকতেন মা, অন্যটিতে মেয়ে এবং বাকি কক্ষটি ব্যবহৃত হতো স্টোররুম হিসেবে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, বাসার ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ বিরাজ করছিল। বিভিন্ন স্থানে আবর্জনা জমে ছিল এবং দুর্গন্ধে পরিবেশ ভারী হয়ে উঠেছিল।
ঘটনার সূত্রপাত হয় গত ৩১ মে। কনিকার ডাকে একজন নার্স বাসায় এসে নূর জাহান বেগমকে দেখতে গেলে পরিস্থিতি দেখে বিস্মিত হন। তিনি বুঝতে পারেন, বৃদ্ধার মৃত্যু তাৎক্ষণিক নয়; বরং কয়েকদিন আগেই তিনি মারা গেছেন। এ সময় মরদেহে পচন ধরেছিল।
আরো পড়ুন…রামিসা হত্যা মামলায় নতুন ধোঁয়াশা, কার দিকে ইঙ্গিত আসামির?
নূর জাহান বেগমের সন্তানদের মধ্যে ড. এ কে এম আনিসুর রহমান বর্তমানে সরকারি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ঘটনার পর প্রথমদিকে তিনি মায়ের পরিচয় অস্বীকার করেছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। পরে বিষয়টি স্বীকার করেন। এ ঘটনার পর তাকে দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে।
জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী জানিয়েছেন, বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। পিতা-মাতার ভরণপোষণ-সংক্রান্ত আইন এবং একজন সরকারি কর্মকর্তার নৈতিক দায়িত্বের বিষয় বিবেচনায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
নূর জাহান বেগমের আরেক ছেলে ড. এ কে এম আশিকুর রহমান দেশের একটি স্বনামধন্য প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। মায়ের মৃত্যুর খবর পেয়ে তিনি হাসপাতালে গিয়ে মরদেহ গ্রহণ করেন। তবে প্রতিবেশী ও তদন্ত-সংশ্লিষ্টদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরেই পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে বৃদ্ধার যোগাযোগ সীমিত ছিল।
তৃতীয় ছেলে এ কে এম আতিকুর রহমান বিদেশে বসবাস করেন। তার বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
প্রতিবেশীরা জানিয়েছেন, কনিকা খুব একটা সামাজিক মেলামেশা করতেন না। বাইরের লোকজনকে বাসায় আসতেও খুব কম দেখা যেত। অনেক সময় প্রয়োজনীয় কাজেও তিনি দরজা খুলে বাইরে বের হতেন না বলে অভিযোগ রয়েছে।
তদন্তকারী কর্মকর্তা জানিয়েছেন, নূর জাহান বেগম দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ ছিলেন। তার স্বামীর মৃত্যুর পর তিনি মেয়ের সঙ্গেই বসবাস করতেন। পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে তার যোগাযোগ খুব সীমিত ছিল। পুলিশের ভাষ্যমতে, এটি একজন বৃদ্ধ মায়ের প্রতি চরম অবহেলার উদাহরণ।
ঘটনার পর বিষয়টি নিয়ে আইনি প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে। বৃদ্ধার মৃত্যুর পেছনের কারণ এবং তার সঙ্গে কোনো ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘন হয়েছে কি না, তা তদন্তের নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন করা হয়েছে।
এ ছাড়া সুপ্রিম কোর্টের এক আইনজীবী নূর জাহান বেগমের চার সন্তানের কাছে আইনি নোটিশ পাঠিয়েছেন। নোটিশে মায়ের ভরণপোষণ, চিকিৎসা, পরিচর্যা এবং নিয়মিত খোঁজখবর রাখার বিষয়ে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, ড. আশিকুর রহমান দাবি করেছেন যে তার মায়ের মানসিক কিছু সমস্যা ছিল এবং তাকে নিয়ে বিভিন্ন গুজব ছড়ানো হচ্ছে। তিনি জানান, একসময় মা তার সঙ্গেই থাকতেন। পরে ২০২৪ সাল থেকে বোনের কাছে অবস্থান করছিলেন। তিনি আরও বলেন, ঈদের সময়ও তিনি মায়ের সঙ্গে দেখা করেছিলেন।
ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও জনমনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, জীবিত অবস্থায় একজন বৃদ্ধ মা কেন এমন পরিস্থিতিতে দিন কাটাতে বাধ্য হলেন এবং তার সন্তানরা কেন যথাযথ দায়িত্ব পালন করতে ব্যর্থ হলেন। তদন্তের মাধ্যমে পুরো ঘটনার প্রকৃত চিত্র সামনে আসবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন।

