১০ বছর ধরে পলিথিনের ঘরে দেলোয়ার-রহিমা দম্পতির জীবনযুদ্ধ

১০ বছর ধরে পলিথিনের ঘরে দেলোয়ার-রহিমা দম্পতির জীবনযুদ্ধ
অভাব-অনটনের তাড়নায় অনেকেই স্ত্রী-সন্তান নিয়ে আত্মহত্যা কিংবা সংসার ভাঙার মতো খবর প্রায়ই শোনা যায়। তবে বাগেরহাটে এক ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে— যেখানে দারিদ্র্যের ঘেরাটোপেও ভালোবাসা, আস্থা আর ত্যাগের অদ্ভুত এক দৃষ্টান্ত গড়েছেন এক দম্পতি।
বাগেরহাট পৌরসভার লঞ্চঘাট এলাকায় পলিথিনে মোড়ানো একটি ছোট্ট ঝুপড়ি ঘরেই টানা দশ বছর ধরে বসবাস করছেন ৭০ বছর বয়সী দেলোয়ার হোসেন শেখ ও তাঁর স্ত্রী রহিমা বেগম (৫৮)। বসবাসের অনুপযোগী সেই ভাঙাচোরা ঘরই তাদের একমাত্র আশ্রয়স্থল।
জীবনের দীর্ঘ ৪৫ বছরের দাম্পত্য যাত্রায় সুখ-দুঃখের নানান অভিজ্ঞতা থাকলেও কঠিন বাস্তবতায় তাঁরা কখনো একে অপরের হাত ছাড়েননি। যেন দারিদ্র্যের আঁধারেও ভালোবাসা ও আস্থার আলোয় এগিয়ে চলার অনন্য দৃষ্টান্ত।
দেলোয়ার হোসেন ছিলেন দিনমজুর। একসময় লঞ্চঘাট এলাকায় শ্রম দিয়ে সংসার চালাতেন। কিন্তু বয়সের ভারে এখন আর কাজের শক্তি নেই। শরীর সাপোর্ট দিলে মাঝে মাঝে ভ্যান চালান তিনি। অন্যদিকে স্ত্রী রহিমা বেগম কাগজ কুড়িয়ে সংসার চালানোর চেষ্টা করেন।
দেলোয়ার হোসেন বলেন,
“আগে শরীরে শক্তি ছিল, কাজ করতাম, তখন সচ্ছলভাবে জীবন চলেছে। এখন বয়স হয়ে গেছে, কাজ করতে পারি না। মাঝে মাঝে ভ্যান চালাই, আর আমার স্ত্রী কাগজ সংগ্রহ করে। এই দিয়েই কোনোমতে সংসার চলে।”
রহিমা বেগম জানান, তাঁদের তিন ছেলে ও এক মেয়ে— সবাইকে বিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু সন্তানেরাও দারিদ্র্যের কারণে বাবা-মায়ের খোঁজখবর নিতে পারে না। স্বামীকে ছেড়ে যাওয়ার প্রশ্নে তিনি বলেন,
“অভাবের কারণে স্বামীকে ছেড়ে যাওয়ার কথা কখনো চিন্তাই করিনি। সুখে যেমন ছিলাম, দুঃখেও তেমন আছি। সংসার মানেই ত্যাগ-ভালোবাসা আর বিশ্বাস। অভাবে পড়ে স্বামী-স্ত্রী একে অপরকে ছেড়ে যায়, এটা আমি বুঝি না।”
স্থানীয় বাসিন্দা হৃদয় শেখ বলেন,
“দীর্ঘদিন ধরে চাচা-চাচিকে এই ঝুপড়ি ঘরে থাকতে দেখছি। আজকের সমাজে যেখানে অভাবে সংসার ভেঙে যায়, সেখানে তাঁরা আমাদের জন্য এক অনন্য উদাহরণ। নতুন প্রজন্মের দম্পতিরা তাদের কাছ থেকে অনেক কিছু শিখতে পারে। সরকারের উচিত তাঁদের সহায়তা করা।”
শেখ আল মামুন নামের আরেক বাসিন্দা বলেন,
“এ প্রজন্মের দম্পতিরা কষ্ট মেনে নিতে চায় না। কিন্তু সংসার মানেই ত্যাগ আর ছাড়। আমাদের চাচা-চাচি আগের দিনের মানুষ, তাঁরা ত্যাগ আর ভালোবাসার ভিত্তিতেই সংসার টিকিয়ে রেখেছেন।”
স্থানীয় ভ্যানচালক কবির শেখ বলেন,
“এই অসহায় বৃদ্ধ দম্পতিকে বহুদিন ধরে এখানে থাকতে দেখছি। সমাজের বিত্তবানদের পাশাপাশি সরকারেরও উচিত তাঁদের পাশে দাঁড়ানো।”
বাগেরহাট সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা এস এম মুস্তাফিজুর রহমান বলেন,
“সরকারি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির মাধ্যমে দরিদ্র ও অসহায় দম্পতিদের সহায়তা করা হয়। দেলোয়ার-রহিমা দম্পতির খোঁজ নিয়ে যথাযথ সহায়তা দেওয়া হবে।”

