জোটের সিদ্ধান্তে চাপে এনসিপি—পদত্যাগের ঢেউয়ে টালমাটাল সংগঠন

ভোটের মাঠে সমীকরণ মেলাতে গিয়ে এখন নিজের ঘর সামলাতেই হিমশিম খাচ্ছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে আসন সমঝোতার সিদ্ধান্তই যেন দলটির জন্য বড় সংকটের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শুরুতে সীমিত পর্যায়ে থাকলেও এখন পদত্যাগের প্রবণতা রূপ নিয়েছে ব্যাপক ঢেউয়ে, যা কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে।
দলের অনেক তৃণমূল ও মধ্যম সারির নেতাকর্মী এই জোটকে সহজভাবে নিতে পারেননি। তাদের অভিযোগ, এই সিদ্ধান্ত দলের আদর্শ থেকে বিচ্যুতি এবং রাজনৈতিক কৌশলে বড় ভুল। ফলে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা অসন্তোষ এখন প্রকাশ্যে এসেছে পদত্যাগের মাধ্যমে। বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা কমিটির নেতারা একসঙ্গে পদত্যাগ করছেন, যা দলটির সাংগঠনিক ভিত্তিকে দুর্বল করে দিচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
এদিকে, পদত্যাগ করা নেতাদের একটি বড় অংশ অন্য রাজনৈতিক দলে যোগ দিচ্ছেন। কেউ বিএনপিতে, কেউ জামায়াতে ইসলামীতে, আবার কেউ নতুন প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হচ্ছেন। এতে এনসিপির সাংগঠনিক কাঠামো আরও নড়বড়ে হয়ে পড়ছে।
সংকট কাটাতে দলের শীর্ষ নেতৃত্ব নানা উদ্যোগ নিচ্ছে। পদত্যাগ করা নেতাদের ফেরাতে ব্যক্তিগত যোগাযোগ, বৈঠক ও পুনর্গঠনের আশ্বাস দেওয়া হচ্ছে। তবে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা ভিন্ন—অনেকেই তাদের সিদ্ধান্তে অনড় থাকছেন।
জামায়াতের সঙ্গে জোট আলোচনার সময়ই প্রথমে পদত্যাগ করেন দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্য সচিব ও আলোচিত চিকিৎসক ডা. তাসনিম জারা। এরপর পর্যায়ক্রমে আরও কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতা পদত্যাগ করেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন যুগ্ম আহ্বায়ক খালেদ সাইফুল্লাহ, তাজনূভা জাবীন, মিডিয়া সেলের সম্পাদক মুশফিক উস সালেহীন, আইসিটি প্রধান ফরহাদ আলম ভূঁইয়া, যুগ্ম সদস্য সচিব আরিফ সোহেলসহ আরও অনেকে।
দলত্যাগী নেতাদের অভিযোগ, এনসিপি পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে পুরোনো রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে আপস করেছে এবং মূল লক্ষ্য থেকে সরে গেছে।
তবে দলের নেতারা বলছেন, অনেকেই ভুল বোঝাবুঝি বা অভিমানের কারণে পদত্যাগ করেছেন। তাদের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে এবং ফিরে এলে সম্মানজনক অবস্থান দেওয়া হবে।
এদিকে বিভিন্ন জেলায় পদত্যাগের ঘটনা বাড়ছেই। চাঁপাইনবাবগঞ্জে জেলা আহ্বায়কসহ চার নেতা পদত্যাগ করেছেন। রংপুরে কমিটি গঠনে বিতর্কের জেরে এক নেতা দায়িত্ব ছেড়েছেন। বাগেরহাটে একযোগে ১২ জন নেতা পদত্যাগ করেন। নীলফামারীতে তিন নেতা জামায়াতে যোগ দিয়েছেন এবং খাগড়াছড়িতে তিন শতাধিক নেতাকর্মী বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন।
পদত্যাগী নেতাদের বক্তব্য অনুযায়ী, তারা পরিবর্তনের আশায় এনসিপিতে যোগ দিয়েছিলেন, কিন্তু বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থান তাদের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি।
অন্যদিকে, দলটির নেতারা এখনো আশাবাদী। কেন্দ্রীয় নেতারা বলছেন, আলোচনা চলছে এবং অনেকেই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করতে পারেন। দলের দরজা সবার জন্য খোলা রয়েছে বলেও তারা জানিয়েছেন।
বর্তমান পরিস্থিতিতে এনসিপির সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখা এবং সাংগঠনিক শক্তি পুনর্গঠন করা।

