জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউটে আরও এক শিশুর মৃত্যু, মাইলস্টোন ট্র্যাজেডিতে নিহত বেড়ে ৩১
ঢাকা, ২৫ জুলাই ২০২৫, শুক্রবার সকাল। রাজধানীর উত্তরায় মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে ভয়াবহ বিমান দুর্ঘটনার ঘটনায় আরও এক শিশুর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩১ জনে। সর্বশেষ নিহত শিশুটির নাম আইমান, বয়স মাত্র ১০ বছর। জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র তথ্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ শাহাদাত হোসেন শুক্রবার সকালে গণমাধ্যমকে এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। নিহত আইমান ছিল দুর্ঘটনায় গুরুতর দগ্ধ হওয়া অনেক শিক্ষার্থীর একজন। মৃত্যুর আগে প্রায় চার দিন ধরে আইসিইউতে তার চিকিৎসা চলছিল।
এর আগের দিন বৃহস্পতিবার (২৪ জুলাই) দুপুরে একে একে আরও দুই শিশুর মৃত্যুর খবর আসে। দুপুর ১টা ৫২ মিনিটে প্রাণ হারায় মাহতাব রহমান ভূঁইয়া (১৪)। একই দিন বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায় মাহিয়া তাসনিম ওরফে মায়া (১৫)। মায়াও দুর্ঘটনার সময় স্কুল প্রাঙ্গণে উপস্থিত ছিল।
দুর্ঘটনার পটভূমি
গত সোমবার (২১ জুলাই) দুপুরে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ চত্বর ও তার আশপাশে স্বাভাবিক দিনের মতোই ক্লাস চলছিল, শিক্ষার্থীরা ব্যস্ত ছিল ক্লাস ও পরীক্ষা নিয়ে। এমন সময় আচমকা বিমানবাহিনীর একটি যুদ্ধবিমান নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে স্কুলের একাংশে বিধ্বস্ত হয়। সঙ্গে সঙ্গে চারপাশে আগুন ছড়িয়ে পড়ে, ভেঙে যায় জানালা-দরজা, ধোঁয়ায় ঢেকে যায় গোটা চত্বর।
দুর্ঘটনার তীব্রতা এতটাই ভয়াবহ ছিল যে, ঘটনার পরপরই উদ্ধার অভিযান শুরু করতে হয় ফায়ার সার্ভিস ও সেনাবাহিনীর দলকে। আহতদের মধ্যে অনেকেই তৎক্ষণাৎ বার্ন ইনস্টিটিউটে ও রাজধানীর অন্যান্য হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
দুর্ঘটনার পর পরই আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) জানায়, ঘটনাস্থলে এবং হাসপাতালে নেওয়ার পর মিলিয়ে মোট ৩১ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। তাদের মধ্যে বেশিরভাগই শিক্ষার্থী, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা ও কর্মচারী। এছাড়া গুরুতর আহত হন অন্তত ১৬৫ জন, যাদের অনেকেই এখনো হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
বিভিন্ন সূত্রের মধ্যে সংখ্যাগত পার্থক্য
দুর্ঘটনার হতাহতের সংখ্যা নিয়ে প্রথম থেকেই কিছুটা বিভ্রান্তি তৈরি হয়। একদিকে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ কর্তৃপক্ষ এক বিবৃতিতে জানায়, তাদের হিসাবে দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা ২২। তবে জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও দু’জনের মৃত্যুর খবর পাওয়ায় সেই সংখ্যা বেড়ে ২৪-এ দাঁড়ায় বলে জানায় কর্তৃপক্ষ।
অন্যদিকে, প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের ফেসবুক পেজে প্রকাশিত একটি তালিকায় দেখা যায়, নিহতের সংখ্যা ৩১ জন। এই সংখ্যা আইএসপিআরের দেওয়া সংখ্যার সাথেও মিলে যায়। নিহতদের মধ্যে বেশির ভাগই ছিল বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী; কেউ কেউ ছিলেন শিক্ষক, নিরাপত্তারক্ষী ও আশপাশের দোকানদারও।
মৃত্যুর মিছিল আর শোকের শহর
এ দুর্ঘটনা শুধু নিহতদের পরিবারের নয়, পুরো দেশের মানুষকে শোকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। যারা প্রাণ হারিয়েছেন, তারা সবাই ছিলেন কারও না কারও সন্তান, ভাই-বোন বা স্বজন। রাজধানীর জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের আইসিইউতে এখনো লড়াই করছেন একাধিক দগ্ধ শিশু ও কিশোর। তাদের কারও শরীরের ৫০ শতাংশের বেশি পুড়ে গেছে।
আরও পড়ুন: ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন চাইলেন জামায়াতের আমির
বৃহস্পতিবার ও শুক্রবারের মৃত্যুর খবর হাসপাতালে এবং নিহতদের পরিবারে নতুন করে শোকের ঢেউ তোলে। নিহত শিশুদের সহপাঠী, শিক্ষক ও প্রতিবেশীরাও শোকে নিস্তব্ধ হয়ে পড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও নিহত শিশুদের ছবি, গল্প আর স্মৃতিচারণে ভরে গেছে।
আহতদের চিকিৎসা ও চীনা চিকিৎসক প্রতিনিধি দল
বৃহস্পতিবার ঢাকায় এসে পৌঁছেছে চীনের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক প্রতিনিধি দল। তারা দগ্ধ ও আহতদের চিকিৎসায় বিশেষ সহায়তা করছেন। জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউটের চিকিৎসকদের সঙ্গে তারা দগ্ধ রোগীদের অবস্থা পর্যালোচনা ও উন্নত চিকিৎসা পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করছেন।
প্রার্থনা ও স্মরণ সভা
দুর্ঘটনায় নিহতদের স্মরণে বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংগঠন শোকসভা ও বিশেষ প্রার্থনার আয়োজন করেছে। সংখ্যালঘু অধিকার পার্টি বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় নিহতদের আত্মার শান্তি কামনায় এক বিশেষ প্রার্থনার আয়োজন করে। স্কুল প্রাঙ্গণের সামনেও নিহতদের স্মরণে মোমবাতি প্রজ্বলন করেছেন সহপাঠী ও অভিভাবকরা।
ডিএনএ পরীক্ষায় মিলেছে নিখোঁজ মায়ের মরদেহ
এ দুর্ঘটনায় নিখোঁজদের মধ্যে ছিলেন এক নারী অভিভাবক। জাতীয় ফরেনসিক বিজ্ঞান ল্যাবরেটরির ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে তার পরিচয় শনাক্ত হয়েছে। তার মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
সর্বশেষ তথ্য ও তদন্ত
বিমান বিধ্বস্তের কারণ অনুসন্ধানে ইতোমধ্যে তদন্ত কমিটি গঠন করেছে বাংলাদেশ বিমানবাহিনী ও বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ। দুর্ঘটনার কারণ, পাইলটের অবস্থা, যান্ত্রিক ত্রুটি ইত্যাদি নানা বিষয় বিশদভাবে যাচাই করা হচ্ছে।
তবে এই ভয়াবহ ট্র্যাজেডি যে দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরাপত্তা, জরুরি প্রস্তুতি ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে, তা স্পষ্ট। এ দুর্ঘটনা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে, নিরাপত্তা পরিকল্পনা কতটা জরুরি এবং প্রতিটি জীবন কতটা অমূল্য।
উপদেষ্টা: এ কে আজাদ চৌধুরী
সম্পাদক ও প্রকাশক: কামরুল হাসান শান্ত
সহ সম্পাদক: সাখাওয়াত হোসেন
© পদ্মা নিউজ ২০২৫ - এর সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত