ইউপি নির্বাচন নিয়ে নতুন ভাবনা, নভেম্বর-ডিসেম্বরে ভোটে আপত্তি
ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচন আয়োজন নিয়ে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) প্রাথমিক পরিকল্পনায় নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। চলতি বছরের নভেম্বর ও ডিসেম্বরে ভোট আয়োজনের প্রস্তুতি নিয়ে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে আপত্তি আসায় আগামী বছরের জানুয়ারি থেকে নির্বাচন শুরুর বিষয়টি আলোচনায় এসেছে।
বৃহস্পতিবার নির্বাচন ভবনে স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে অনুষ্ঠিত আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় এসব বিষয় উঠে আসে। সভায় অংশ নেওয়া সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কয়েকজনের বক্তব্য অনুযায়ী, নির্বাচন আয়োজনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে আরও সময় দরকার। এ বিষয়ে বিস্তারিত প্রস্তুতির সময়সীমা জানাতে প্রায় এক মাস সময় চেয়েছে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এএমএম নাসির উদ্দিনের সভাপতিত্বে দুপুর আড়াইটার পর শুরু হওয়া বৈঠকটি শেষ হয় বিকেল ৪টার দিকে। এতে চার নির্বাচন কমিশনারের পাশাপাশি মন্ত্রিপরিষদ সচিব, জনপ্রশাসন সচিব, শিক্ষা সচিব, আইজিপি এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা অংশ নেন।
এর আগে ইসি সাত ধাপে ইউপি ভোট আয়োজনের একটি সম্ভাব্য সময়সূচি তৈরি করেছিল। সেই পরিকল্পনায় প্রথম ধাপের ভোট ১২ নভেম্বর, দ্বিতীয় ধাপ ১৩ ডিসেম্বর এবং তৃতীয় ধাপ ৩০ ডিসেম্বর করার কথা ছিল। এরপর চতুর্থ ধাপ ১৭ জানুয়ারি, পঞ্চম ধাপ ৪ ফেব্রুয়ারি, ষষ্ঠ ধাপ ২২ এপ্রিল এবং সর্বশেষ সপ্তম ধাপ ২৭ মে ভোট আয়োজনের সম্ভাব্য তারিখ নির্ধারণ করা হয়।
তবে এই সময়সূচি তখনও চূড়ান্ত ছিল না। আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকের পর সংশ্লিষ্ট সবার মতামত নিয়ে সময়সূচি চূড়ান্ত করার কথা জানিয়েছিল কমিশন।
নভেম্বর-ডিসেম্বরে কেন আপত্তি?
বৈঠকে ইসির পক্ষ থেকে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সচিবদের কাছে জানতে চাওয়া হয়, কোন সময়ে নির্বাচন আয়োজন করলে প্রশাসনিকভাবে সবচেয়ে সুবিধা হবে।
জবাবে মন্ত্রিপরিষদ সচিব জানান, নভেম্বর ও ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচন আয়োজনের মতো প্রস্তুতি প্রশাসনের নেই। নির্বাচন পরিচালনার জন্য কতটা সময় প্রয়োজন, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানাতে আরও সময় লাগবে। এ জন্য প্রায় এক মাস সময় চাওয়া হয়। একই সঙ্গে সম্ভাব্য নির্বাচনী সময়সূচি ঘোষণার আগে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করা হলে ভালো হতো বলেও মত দেন তিনি।
এ সময় সিইসি জানান, ইসির তৈরি সময়সূচি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ের। প্রতিটি ধাপের ভোটের মধ্যে অন্তত ১৫ দিনের ব্যবধান রাখার বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
জনপ্রশাসন সচিবও অর্থ বরাদ্দের বিষয়টি তুলে ধরেন। তাঁর প্রশ্ন ছিল, বৈঠকে অর্থ সচিব উপস্থিত না থাকলে নির্বাচনের প্রয়োজনীয় অর্থসংক্রান্ত বিষয়গুলো কীভাবে চূড়ান্ত করা হবে।
বৈঠকে আরও একজন সচিব জানান, সাম্প্রতিক বন্যার প্রভাব পুরোপুরি সামাল দেওয়া সম্ভব হয়নি। এর পাশাপাশি নির্বাচনে দায়িত্ব পালনের জন্য শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। নভেম্বর ও ডিসেম্বরে বার্ষিক পরীক্ষা, বৃত্তি পরীক্ষাসহ বিভিন্ন পরীক্ষা থাকায় শিক্ষকরা ব্যস্ত থাকবেন। স্কুল-কলেজকে ভোটকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হলে শিক্ষা কার্যক্রমেও সমস্যা তৈরি হতে পারে।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা সচিবও নভেম্বর-ডিসেম্বর সময়ে শিক্ষকদের ব্যস্ততার বিষয়টি তুলে ধরেন। তিনি জানান, নভেম্বরে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক দল আসবে এবং ডিসেম্বরজুড়ে তারা শিক্ষার মানসংক্রান্ত কার্যক্রম পরিচালনা করবে। ফলে শিক্ষকরা ওই সময়ে ব্যস্ত থাকবেন।
পুলিশের পক্ষ থেকেও জানুয়ারির প্রস্তাব
বৈঠকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও আলোচনা হয়। আইজিপি নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসে বিভিন্ন জাতীয় দিবস ও অন্যান্য দায়িত্বের কারণে পুলিশের ব্যস্ততার কথা জানান। তাঁর মতে, জানুয়ারি থেকে নির্বাচন শুরু হলে পুলিশের জন্য প্রস্তুতি ও দায়িত্ব পালন তুলনামূলকভাবে সহজ হবে।
পুলিশের পক্ষ থেকে আরও জানানো হয়, নির্বাচনী দায়িত্ব পালনের জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করতে ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় প্রয়োজন হতে পারে। এরই মধ্যে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দায়িত্ব পালনের জন্য পুলিশের নির্বাচনী প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
৬ জুনের আগেই শেষ করার পরিকল্পনা
বৈঠক শেষে নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেন, নির্বাচনের সময় হাতে খুব বেশি ফাঁকা জায়গা নেই। নভেম্বর ও ডিসেম্বরজুড়ে বিভিন্ন পরীক্ষা থাকায় সময়ের সংকট রয়েছে। জানুয়ারিতে কিছুটা সুযোগ পাওয়া গেলেও পরবর্তী সময়ে রোজা ও এসএসসি পরীক্ষা রয়েছে। আবার এসএসসি পরীক্ষার পর ৬ জুন থেকে এইচএসসি পরীক্ষা শুরু হওয়ার আগে কিছুটা সময় পাওয়া যাবে।
ইউপি নির্বাচনের আগে ঘোষিত সম্ভাব্য সময়সূচি থেকে কমিশন সরে এসেছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি তা অস্বীকার করেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, আগামী বছরের ৬ জুনের আগেই ইউপি নির্বাচন শেষ করার বিষয়ে বৈঠকে অংশ নেওয়া সবাই একমত হয়েছেন।
সানাউল্লাহ বলেন, কমিশনের প্রকাশ করা সময়সূচিটি ছিল কেবল সম্ভাব্য বা প্রাথমিক একটি পরিকল্পনা। এটি আগে থেকেই করা প্রস্তুতির ভিত্তিতে তৈরি করা হয়েছিল এবং ১৭ সেপ্টেম্বরের আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকের পর পাওয়া তথ্য ও মতামত বিবেচনা করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা ছিল।
তিনি জানান, বৈঠক থেকে পাওয়া নতুন তথ্য বিশ্লেষণ করে কমিশন পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবে। অন্যান্য স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়েও আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সময়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
ঠাকুরগাঁও-১ উপনির্বাচনেও বিশেষ নিরাপত্তা
ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচন নিয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়। এ বিষয়ে সানাউল্লাহ জানান, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতোই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা ব্যবহার করা হবে। সেনাবাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট সব বাহিনী সেখানে দায়িত্ব পালন করবে।
এদিকে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে সম্ভাব্য ভোটকেন্দ্রগুলোর সিসি ক্যামেরা সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করছে নির্বাচন কমিশন। মাঠপর্যায়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আগামী ২৪ সেপ্টেম্বরের মধ্যে এসব তথ্য ইসি সচিবালয়ে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ফলে এখন বড় প্রশ্ন—ইউপি ভোট কি শেষ পর্যন্ত নভেম্বর-ডিসেম্বরে হবে, নাকি নতুন পরিকল্পনায় জানুয়ারি থেকে শুরু হবে? এ বিষয়ে আন্তঃমন্ত্রণালয় সভার তথ্য পর্যালোচনার পর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাবে নির্বাচন কমিশন।
উপদেষ্টা: এ কে আজাদ চৌধুরী
সম্পাদক ও প্রকাশক: কামরুল হাসান শান্ত
সহ সম্পাদক: সাখাওয়াত হোসেন
© পদ্মা নিউজ ২০২৫ - এর সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত