
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনা হতে যাচ্ছে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র-এ। মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) থেকে কেন্দ্রটির প্রথম ইউনিটে পারমাণবিক জ্বালানি লোডিং কার্যক্রম শুরু হওয়ার কথা রয়েছে, যা দেশকে কার্বনমুক্ত বিদ্যুৎ উৎপাদনের দিকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নেবে।
এই অগ্রগতিকে একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে উল্লেখ করেছেন বিশিষ্ট পরমাণু বিজ্ঞানী ড. শৌকত আকবর। তিনি একসময় বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন-এর চেয়ারম্যান ছিলেন এবং রূপপুর প্রকল্পের প্রথম প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তার পরিকল্পনা ও নেতৃত্বেই প্রকল্পটির ভিত্তি তৈরি হয় এবং আজ তা বাস্তবায়নের গুরুত্বপূর্ণ ধাপে পৌঁছেছে।
এর আগে গত ১৬ এপ্রিল বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ ইউনিট-১ এ জ্বালানি প্রবেশের জন্য আনুষ্ঠানিক অনুমোদন প্রদান করে।
পারমাণবিক জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হবে লো-এনরিচড ইউরেনিয়াম, যেখানে ইউরেনিয়াম-২৩৫ এর পরিমাণ থাকে প্রায় ২.৪% থেকে ৪.৯৫%। এই জ্বালানি ছোট ছোট পেলেট আকারে থাকে, যার প্রতিটি মাত্র কয়েক গ্রাম ওজনের হলেও শক্তি উৎপাদনে অত্যন্ত সক্ষম—প্রায় এক টন কয়লার সমতুল্য। এই পেলেটগুলো বিশেষ জিরকোনিয়াম অ্যালয়ের তৈরি ফুয়েল রডে সংরক্ষণ করা হয়, যা নিরাপত্তা নিশ্চিত করে।
একাধিক ফুয়েল রড মিলিয়ে তৈরি হয় একটি ফুয়েল অ্যাসেম্বলি। ইউনিট-১ এর রিঅ্যাক্টরে মোট ১৬৩টি ফুয়েল অ্যাসেম্বলি ব্যবহার করা হবে। এগুলো ধাপে ধাপে রিঅ্যাক্টরের কোরে স্থাপন করা হবে এবং পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে অত্যন্ত সতর্কতা ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মান বজায় রেখে।
আন্তর্জাতিক সংস্থা আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (IAEA)-এর মতে, প্রথম জ্বালানি লোডিংয়ের মাধ্যমে একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ পর্যায় থেকে পরিচালন পর্যায়ে প্রবেশ করে। এটি বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরুর আগে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।
জ্বালানি প্রবেশের আগে বিভিন্ন প্রি-অপারেশনাল পরীক্ষা সম্পন্ন করা হয়, যেখানে যন্ত্রপাতি, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং পরিচালন কাঠামো যাচাই করা হয়। সবকিছু সন্তোষজনক হলে নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদনের পর শুরু হয় জ্বালানি লোডিং।
এই প্রক্রিয়ায় প্রশিক্ষিত দেশীয় প্রকৌশলী ও অপারেটররা রাশিয়ার বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় আধুনিক যন্ত্র ব্যবহার করে রিঅ্যাক্টরের কোরে একে একে ফুয়েল অ্যাসেম্বলি স্থাপন করবেন। পুরো সময়জুড়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিউট্রন পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা সক্রিয় থাকবে এবং রিঅ্যাক্টরকে সাব-ক্রিটিক্যাল অবস্থায় রাখা হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনায় নেওয়ার এই পর্যায়টি সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং। এখানে প্রযুক্তিগত দক্ষতার পাশাপাশি প্রয়োজন শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, প্রশিক্ষিত জনবল এবং সমন্বিত অবকাঠামো।
চুক্তি অনুযায়ী, প্রথম তিন বছরের জ্বালানি ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা, অর্থাৎ বছরে গড়ে এক হাজার কোটি টাকা। একই পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদনে কয়লা বা তেলের তুলনায় এই ব্যয় তুলনামূলকভাবে কার্যকর। এছাড়া পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের আয়ু প্রায় ৬০ বছর, যা যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে আরও বাড়ানো সম্ভব।
সব মিলিয়ে, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের এই অগ্রগতি বাংলাদেশকে টেকসই ও পরিবেশবান্ধব জ্বালানি ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার এক বড় পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
উপদেষ্টা: এ কে আজাদ চৌধুরী
সম্পাদক ও প্রকাশক: কামরুল হাসান শান্ত
সহ সম্পাদক: সাখাওয়াত হোসেন
© পদ্মা নিউজ ২০২৫ - এর সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত