উপজেলা পরিষদ ব্যবস্থা নিয়ে অনিশ্চয়তা, থাকছে কি না নতুন প্রশ্ন
স্থানীয় সরকার কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ একটি স্তর উপজেলা পরিষদ—এটি থাকবে কি না, তা নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বিএনপি নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে এ বিষয়ে দ্বিধা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সংশ্লিষ্ট একাধিক শীর্ষ নেতা ও মন্ত্রীর সঙ্গে আলাপ থেকে বোঝা যাচ্ছে, বর্তমান কাঠামোর উপজেলা পরিষদ ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ার বিষয়ে তেমন আগ্রহ নেই।
এ ধরনের অবস্থান অবশ্য নতুন নয়। ১৯৯১ সালে ক্ষমতায় এসে তৎকালীন খালেদা জিয়া সরকার এরশাদ আমলে চালু হওয়া উপজেলা পরিষদ ব্যবস্থা বাতিল করে। একই বছরের নভেম্বরে অধ্যাদেশ জারি করে এটি আনুষ্ঠানিকভাবে বিলুপ্ত করা হয়।
সম্প্রতি উপজেলা পরিষদ কার্যালয়ে সংসদ সদস্যদের জন্য ‘পরিদর্শন কক্ষ’ স্থাপনের সিদ্ধান্ত ঘিরে আবারও বিতর্ক শুরু হয়েছে। সরকার বলছে, এটি প্রশাসনিক সমন্বয় ও জনসম্পৃক্ততা বাড়ানোর উদ্যোগ। তবে স্থানীয় সরকার বিশ্লেষকদের মতে, এটি কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধির ইঙ্গিত বহন করে।
ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়, ১৯৯৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকার উপজেলা পরিষদ আইন প্রণয়ন করলেও নির্বাচন আয়োজন করেনি। পরে ২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার নির্বাচন আয়োজন করে। তবে পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ সরকার সেটিকে পূর্ণাঙ্গ আইনে রূপ দেয়নি। ২০০৯ সালে নতুন আইন করে সংসদ সদস্যদের উপদেষ্টা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয় এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের (ইউএনও) প্রশাসনিক প্রধান হিসেবে প্রতিষ্ঠা দেওয়া হয়।
এর ফলে উপজেলা পরিষদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ক্ষমতা কার্যত সীমিত হয়ে পড়ে। বিশ্লেষকদের মতে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই প্রতিষ্ঠানটি তার কার্যকারিতা ও স্বায়ত্তশাসন হারাতে থাকে। ২০১৫ সালে দলীয় প্রতীকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন চালুর পর এ প্রবণতা আরও জোরালো হয়।
ছাত্র-জনতার গণআন্দোলনের প্রেক্ষাপটে ৫ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগের পর স্থানীয় সরকারের অনেক জনপ্রতিনিধি আত্মগোপনে চলে যান। ফলে উপজেলা পরিষদসহ বিভিন্ন স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান কার্যত অচল হয়ে পড়ে। পরবর্তীতে দেশের ৪৯৩টি উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যানকে অপসারণ করে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়।
বর্তমানে উপজেলা পরিষদগুলোতে নির্বাচিত প্রতিনিধির অনুপস্থিতি থাকলেও সরকার ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন আয়োজনের দিকে এগোচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, তৃণমূল পর্যায়ে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে এটি একটি কৌশল হতে পারে।
বিএনপির এক স্থায়ী কমিটির সদস্য বলেন, স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করতে হলে তা হতে হবে নিরপেক্ষ ও কার্যকর কাঠামোর ভিত্তিতে। তার মতে, নব্বইয়ের দশকের মডেলে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ কম এবং জবাবদিহিতা বেশি ছিল—যা এখন অনুপস্থিত।
বাস্তবে উপজেলা পরিষদের নির্বাচিত চেয়ারম্যানদের ভূমিকা অনেক ক্ষেত্রেই সীমিত। পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ না থাকায় উন্নয়ন কার্যক্রমে তারা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন না। অধিকাংশ সিদ্ধান্তই সংসদ সদস্য ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের প্রভাবেই পরিচালিত হয়।
স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ড. বদিউল আলম মজুমদার মনে করেন, উপজেলা পরিষদ ভবনে সংসদ সদস্যদের জন্য আলাদা কক্ষ স্থাপন একটি আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত হতে পারে। এতে স্থানীয় সরকারের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে এবং ‘এমপি-নির্ভর’ প্রশাসনিক সংস্কৃতি তৈরি হতে পারে।
উপজেলা পরিষদ আইনে মোট ১৭টি প্রধান কাজ ও ৩৮ ধরনের দায়িত্ব নির্ধারিত রয়েছে। এর মধ্যে আইনশৃঙ্খলা, অবকাঠামো উন্নয়ন, কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সমাজকল্যাণসহ বিভিন্ন খাতে ভূমিকা রাখার কথা বলা হয়েছে। তবে প্রয়োজনীয় আর্থিক ক্ষমতা না থাকায় এসব দায়িত্ব বাস্তবায়ন প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
এ বিষয়ে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মন্তব্য করতে রাজি হননি। অন্যদিকে স্থানীয় সরকার মন্ত্রী ও বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানান, শিগগিরই স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজন করা হবে, তবে উপজেলা পরিষদ নিয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, উপজেলা পরিষদ জেলা ও ইউনিয়নের মধ্যবর্তী গুরুত্বপূর্ণ স্তর। এখানে কার্যকর প্রতিনিধিত্ব না থাকলে উন্নয়ন কার্যক্রমে সমন্বয়হীনতা দেখা দিতে পারে। পাশাপাশি, এই স্তরে রাজনৈতিক উপস্থিতি না থাকলে তৃণমূল পর্যায়ে দলের ভিত্তিও দুর্বল হতে পারে।
উপদেষ্টা: এ কে আজাদ চৌধুরী
সম্পাদক ও প্রকাশক: কামরুল হাসান শান্ত
সহ সম্পাদক: সাখাওয়াত হোসেন
© পদ্মা নিউজ ২০২৫ - এর সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত